
সর্বোচ্চ বিক্রির তালিকায় তাফহীমুল কোরআন ও ফাঁসির সেল থেকে দেখা বাংলাদেশ।
রফিক মোহাম্মদ:
সারি সারি শামিয়ানার নিচে দোকানের পর দোকান। সামনে হাজারো উৎসুক দর্শনার্থী। কারও হাতে ইসলামী সাহিত্য। কারও হাতে দারসুল কুরআন। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অপলক দৃষ্টি রেখে পড়ছেন তারা। কারও চোখে-মুখে রাজ্যের উচ্ছ্বাস। কারণ দীর্ঘ ১৭ বছর পর এ ময়দানে হচ্ছে তাফসিরুল কুরআন মাহফিল। এ মাহফিল ঘিরে বসেছে বই বিক্রির আসর। শত শত মানুষ মন ভরে কিনে নিচ্ছেন পছন্দের সব ইসলামী সাহিত্য, হাদীস কিংবা কোরানের তাফসির।
দীর্ঘ ১৭ বছর পর চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক রজব আলী (প্যারেড) ময়দানে পাঁচ দিনব্যাপী আয়োজিত তাফসিরুল কোরান মাহফিলের বৃহস্পতিবার বিকেলে স্টলগুলোর চিত্র ছিল এমন। স্টল ঘুরে দেখা গেছে, ক্রেতা, বিক্রেতাদের ব্যস্ত সময় পার করার দৃশ্য।
তাফসিরুল কোরান মাহফিলের আয়োজক ইসলামী সমাজ কল্যাণ পরিষদের দায়িত্বশীলরা জানিয়েছেন, শতাধিক স্টলে বই বিক্রি হচ্ছে। ঢাকা থেকে বড় বড় প্রকাশক এই মাহফিলে স্টল দিয়েছে। ৫ দিন ধরে চট্টগ্রামের আশপাশের জেলা, উপজেলা থেকে মাহফিলে আসা মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে বই কিনছে। বিগত ১৬ বছর এই মাঠে মাহফিল আয়োজন হয়নি। তাই স্টলগুলোতে বই বিক্রি হচ্ছে প্রচুর।
স্টলগুলো ঘুরে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে আল্লামা সাঈয়েদ আবুল আলা মওদূদী রচিত বিখ্যাত তাফসির গ্রন্থ তাফহীমুল কোরান। ২২০০ টাকা ২৪০০ টাকায় ১৯ খণ্ডের এই তাফসির বিক্রি হচ্ছে। প্রথম চার দিনে শতাধিক স্টলে ৩-৪ হাজার এই তাফসির বিক্রি হয়েছে বলে জানিয়েছে বিভিন্ন স্টলের বিক্রেতারা।
এরপর সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে অধ্যাপক মফিজুর রহমান রচিত বিভিন্ন গ্রন্থ। প্রচ্ছদ প্রকাশনের দেওয়া স্টলের ম্যানেজার সাবিত জানান, তাঁর লিখা নির্বাচিত দারসুল কুরআন, নির্বাচিত দারসুল হাদিস। এছাড়া মুহাম্মদ কামরুজ্জামানের লিখা ফাঁসির সেল থেকে দেখা বাংলাদেশ বইটিও বিক্রি হয়েছে প্রচুর। এএইচ এম হামিদুর রহমান আজাদের লিখা ‘আল্লামা সাঈদী একটি সোনালী ইতহাস’ বইটিও বিক্রি হয়েছে এই স্টল থেকে সর্বোচ্চ।
তালবিয়া প্রকাশনের স্টলের বিক্রেতা মাহবুব মাসুদ রানা বলেন, দীর্ঘদিন পর চট্টগ্রামের প্যারেড ময়দানে তাফসির মাহফিল হচ্ছে। ইসলাম প্রিয় মানুষ মাহফিলে এসে বই কিনছে। এবার ‘যুবক, ইউ আর দ্য গেম চেঞ্জার’, ‘যেমন তরুণ চাই, ড. মুহাম্মদ রুহুল আমিন রব্বানীর লিখা যুব সমাজের চল্লিশ হাদিস, ফাহমিদুর রহমানের ‘ইকবাল মননে অন্বেষণে’, গোলাম সামাদের ‘আত্মপরিচয়ের সন্ধানে’, জিয়াউল হকের ‘অন্তর মম বিকশিত করো’ বইগুলো আমাদের স্টলে বেশি বিক্রি হয়েছে। বাংলাদেশ কো-অপারেটিভ বুক সোসাইটির স্টলে বেশি বিক্রি হচ্ছে নসীম হিজাযীর মরণজয়ী, শেষ প্রান্তর।
এছাড়া রুহামা পাবলিকেশন হেদায়েতুল্লাহ মেহমান্দের লিখা ইফতেখার সিফাত অনূদিত ‘ইতিহাসের আয়নায় বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা’, ড. খালিদ আবু শাদির লিখা ‘সময়ের সঠিক ব্যবহার কিভাবে করবেন?’ ইবনুল জাওজি’র (রহ) লিখা মুফতি তারেকুজ্জামান অনূদিত অশ্রুসাগর বেশি বিক্রি হচ্ছে বলে জানিয়েছে এই স্টলের বিক্রেতারা।
সন্দীপন প্রকাশনের স্টলে ডা. শামসুল আরেফিনের লিখা পরানবন্দি, দাঊদ ইবনু সুলাইমান উবাইদির লিখা ‘শেষের অশ্রু’ শায়খ মোখতার আহমেদের ‘নাসীহাহ’ ও ‘সোনালি যুগের মায়েরা’ ড. খালিদ আবু শাদী ও ডা. শামসুল আরেফিনের লিখা আহমাদ ইউসুফ শরীফ অনূদিত ‘মনের মতো সালাত’ প্রচুর পরিমাণে বিক্রি হয়েছে।
আযাদ বুকসের বিক্রেতা এরশাদ জানান, জীবন ঘনিষ্ঠ বিষয়ে সহীহ হাদীস, মুহাম্মদ কামরুজ্জামানের ফাঁসির সেল থেকে দেখা বাংলাদেশ, ইবনু কাসিরের (রাহ) আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া তাদের স্টল থেকে প্রচুর কিনেছে মানুষ।
আধুনিক প্রকাশনীতে আল্লামা সাঈয়েদ আবুল আলা মওদূদী রচিত বিখ্যাত তাফসির গ্রন্থ তাফহীমুল কুরআন কিনতে ভিড় দেখা গেছে। এছাড়া এই প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের স্টলে আর রাহীকুল মাখতুম, কবিরা গুনাহ, রিয়াদুস সালেহীন, আল্লামা ইউসুফ ইসলাহীর লিখা ইসলামে মাতা-পিতা ও সন্তানের অধিকার শিরোনামের বই বেশি বিক্রি হয়েছে বলে জানিয়েছে বিক্রেতারা।
এছাড়া গার্ডিয়ান পাবলিকেশনের স্টলে আরিফ আজাদের প্যারাডক্সিক্যা সাজিদ, ড. মাজিদ আলি খানের লিখা মুহাম্মদ দ্যা ফাইনাল ম্যাসেঞ্জার, ড. ইয়াসির ক্বাদির লিখা ‘মুহাম্মদ’ বেশি বিক্রি হয়েছে।
বই কিনতে আসা দর্শনার্থী আব্দুস শাকুর দৈনিক কর্ণফুলীকে বলেন, ‘চট্টগ্রামের প্যারেড ময়দানে আয়োজিত তাফসিরুল কুরআন মাহফিলে এসে আমরা নিজেদের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করার একটি সুযোগ পেয়েছি। এ মাহফিলের অন্যতম আকর্ষণ হলো ইসলামী বই মেলা।
যে বইগুলো পড়ে মানুষের ইহকাল ও পরকালীন শান্তি নিশ্চিত হবে সে বইগুলোকে গত ১৬ বছর জিহাদী বই আখ্যা দিয়ে একপ্রকার বিক্রি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। এই মাহফিলে এসে সেই গ্রন্থগুলোই মানুষ মন ভরে কিনছে। ইসলামী সাহিত্য, কুরআন ও হাদিসের আলোকে মানব জীবন গড়তে সুন্দর পরিবেশ তৈরি দেওয়ায় আমরা আল্লাহ’র দরবারে শুকরিয়া জ্ঞাপন করছি।’
সাতকানিয়া উপজেলা থেকে মাহফিলে আসা শহিদুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘদিন পর প্যারেড ময়দানের তাফসির মাহফিল হচ্ছে। এটি ইসলামী প্রিয় জনতার একটি আবেগময় মিলন স্থল। এখানের অন্যতম আকর্ষণ বই মেলা। দীর্ঘদিন এই মাহফিল করতে না দেওয়ায় এ অঞ্চলের মানুষ ইসলামী বই কেনার সুযোগ থেকে অনেকটা বঞ্চিত হয়েছে। স্টলগুলোতে দাঁড়িয়ে কিছু বই পড়লাম। কিছু ইসলামী সাহিত্য কিনলাম।
