
নাছির চৌধুরী :
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের প্রতীক হয়ে ওঠা চট্টগ্রামের পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত আজ নিজের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে লিপ্ত। লবণাক্ত বাতাসে প্রকৃতির স্বাদ নিতে আসা হাজারো মানুষ এখন মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। কারণ, সৈকতের ঢেউয়ের ধ্বনি আর চোখ জুড়ানো প্রাকৃতিক দৃশ্যপট হারিয়ে যাচ্ছে শত শত অবৈধ দোকানের চিৎকার, প্লাস্টিক বর্জ্য আর অনিয়ন্ত্রিত জনসমাগমের ভিড়ে।
এই পতেঙ্গা- যেখানে এক সময় সাধারণ মানুষ হেঁটে বেড়াতো নির্জনতায়, পরিবাররা সূর্যাস্ত উপভোগ করতো স্বস্তির নিঃশ্বাসে, এখন সেখানে প্রতিটি কোণে চোখে পড়ে ব্যবসার হিসাব-নিকাশ আর অব্যবস্থাপনার করুণ চিত্র।
ভিড় বাড়ছে, জায়গা কমছে :
পতেঙ্গা সৈকত যেন এখন চট্টগ্রামবাসীর একমাত্র ভরসার জায়গা হয়ে উঠেছে। শহরের অন্যান্য বিনোদন কেন্দ্রগুলো একে একে বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর মানুষ দলে দলে এখানে ভিড় করছেন একটু শান্তির খোঁজে। বিপ্লব উদ্যান, কাজির দেউড়ির শিশু পার্ক, আগ্রাবাদ কর্ণফুলী শিশু পার্ক এবং বহদ্দারহাটের স্বাধীনতা কমপ্লেক্স—এই চারটি বড় বিনোদন কেন্দ্র এখন বন্ধ। এর ফলে সৈকতের উপর চাপ বেড়েছে বহুগুণ।
ট্যুরিস্ট পুলিশের তথ্যমতে, স্বাভাবিক দিনে সৈকতে ২০-৩০ হাজার দর্শনার্থী এলেও ছুটির দিনে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৫০ হাজার। ঈদ বা অন্য উৎসবের সময় দর্শনার্থীর সংখ্যা এক লাখ ছাড়িয়ে যায়। এত মানুষের চাপ সামাল দেওয়ার মতো পরিকল্পনা বা অবকাঠামো কোথাও নেই।
সৌন্দর্যের ওপর দোকানের ছাউনি :
পতেঙ্গার পুরো পাঁচ কিলোমিটারজুড়ে গড়ে উঠেছে প্রায় ২০০টিরও বেশি খাবারের দোকান, চটের ছাউনি দিয়ে তৈরি অস্থায়ী কাঠামো, খেলনা ও বিভিন্ন পণ্যের বিক্রয় কেন্দ্র। এসব দোকান বসার জায়গা, হাঁটার পথ এমনকি সিডিএর লাগানো বাগান পর্যন্ত দখল করে নিয়েছে। যেখানে রঙিন ব্লকে বসে প্রকৃতি দেখার কথা ছিল, সেখানে এখন রান্নার গন্ধ আর বিক্রেতার হাঁকডাকে পর্যটকরা বিরক্ত।
অনেক পর্যটক অভিযোগ করেছেন, সৈকতে এখন প্রকৃতি দেখার জায়গা নেই। যারা হাঁটতে আসেন, তারা বারবার দোকানিদের ডাকাডাকিতে বিরক্ত হয়ে পড়েন। আর যারা বসতে চান, তারা কোথাও জায়গা পান না—কারণ সবখানে কোনো না কোনো দোকান বসে গেছে।
“দাম জিজ্ঞেস না করেই খাবেন না” :
সৈকতে খাবারের দোকানগুলো যেন নিয়মের বাইরের এক জগৎ। পর্যটকদের অভিযোগ, অধিকাংশ দোকানে কোনো মেনু নেই, খাবারের দাম আগে থেকে জানানো হয় না। দাম জিজ্ঞেস না করলে পরে চড়া মূল্য আদায় করা হয়। পর্যটক কাশবি আক্তার জানান, “আমরা কয়েকজন মিলে কিছু খেয়েছিলাম, দাম না জিজ্ঞেস করেই অর্ডার দিই। পরে বিল আসল প্রায় দ্বিগুণ। বললে দোকানদার রেগে যায়, আশপাশের দোকানিরাও ঘিরে ধরে।”
এমন পরিস্থিতিতে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বিশেষ করে নারী ও পরিবারসহ আসা পর্যটকেরা। অভিযোগ করার কোনো নির্দিষ্ট কেন্দ্র বা ট্যুরিস্ট ইনফরমেশন ডেস্ক নেই।
চাঁদার রাজনীতি :
অবৈধ দোকান স্থাপন কীভাবে সম্ভব? এর পেছনে রয়েছে আরেকটি চিত্র-অদৃশ্য চাঁদার রাজনীতি। দোকানদারদের সূত্র মতে, প্রতিটি দোকান দৈনিক ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা করে ভাড়া দেয় স্থানীয় প্রভাবশালীদের। মাসিক চুক্তিতে দিতে হয় ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত। এছাড়া প্রতিদিন ১০০ থেকে ৩০০ টাকা চাঁদা আদায় হয়, যার একটি অংশ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও রাজনৈতিক মহলে ভাগ হয়ে যায়।
এই অর্থনৈতিক স্রোতের ফলে পতেঙ্গার অবৈধ দখলদারিত্ব যেন এক ‘সিস্টেম’-এ পরিণত হয়েছে, যেখানে প্রতিটি দোকান একটি শৃঙ্খলবদ্ধ চক্রের অংশ। অনেকেই বলছে, আগে এসব দোকান থেকে আওয়ামী লীগের লোকজন চাঁদার টাকা তুলতো। এখন তাদের স্থলে বিএনপির নামধারী কিছু লোক এ টাকা তুলছে।
প্রশাসনের অঙ্গীকার ও বাস্তবতা
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) প্রধান প্রকৌশলী কাজী হাসান বিন শামস্ বলেন, “পতেঙ্গা সৈকতের সৌন্দর্য ধ্বংস করার অধিকার কারো নেই। অবৈধ দোকান উচ্ছেদের পরিকল্পনা চলছে, খুব দ্রুতই অভিযান চালানো হবে।”
তবে এই প্রতিশ্রুতি নতুন নয়। অতীতেও বেশ কয়েকবার এমন ঘোষণা এসেছে, কিন্তু কার্যকর কিছু হয়নি। প্রতিবারই প্রভাবশালী মহলের চাপে অভিযান মাঝপথে থেমে গেছে কিংবা একদিনের লোক দেখানো অভিযান চালিয়ে আবার আগের অবস্থায় ফিরে গেছে সৈকত।
আমরা কি পতেঙ্গাকে বাঁচাতে পারবো? :
প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত পতেঙ্গা-ফৌজদারহাট আউটার রিং রোড প্রকল্পের আওতায় সৈকতের সৌন্দর্যবর্ধন ও আধুনিকায়ন করা হয়েছিল। বসার স্থান, হাঁটার পথ, বাগান, আলোকসজ্জা-সবই ছিল এক সুন্দর পরিকল্পনার অংশ। কিন্তু সেই পরিকল্পনা আজ হারিয়ে গেছে দখলদারিত্ব ও প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তার কারণে।
সচেতন নাগরিকরা বলছেন, এখনই পদক্ষেপ না নিলে পতেঙ্গা পরিণত হবে আরেকটি বাজার এলাকায়-যেখানে থাকবে না প্রকৃতি, থাকবে শুধু পণ্যের দাম হাঁকার আওয়াজ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই পর্যটন কেন্দ্রটিকে বাঁচাতে হলে প্রয়োজন: বৈধ দোকান উচ্ছেদন, নির্ধারিত ব্যবসা জোন, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা, সুশৃঙ্খল ট্যুরিস্ট ম্যানেজমেন্ট ও পরিবেশ বান্ধব পরিকল্পনার বাস্তবায়ন করা।
পতেঙ্গা কেবল একটি সৈকত নয়-এটি চট্টগ্রামবাসীর আবেগ, স্বস্তি, আর পরিচয়ের অংশ। ঢেউয়ের ধ্বনি, সূর্যাস্তের রং, বাতাসের স্নিগ্ধতা-সব হারিয়ে যাচ্ছে যদি আমরা এখনই না জাগি।
