বৃহস্পতিবার , ২৬শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

পার্বত্য চট্টগ্রাম

রাঙামাটি স্বাস্থ্য বিভাগে সংযুক্তিতে যত মধু

  •  টাকা দিলেই মিলছে বিধি বর্হিভুত সব অবৈধ আদেশ
  •  মূল কর্মস্থল ছেড়ে অন্যের চাকরিতে ব্যস্ত স্যানিটারি ইন্সপেক্টর,  স্বাস্থ্য সহকারীসহ তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারিরা

নিজস্ব প্রতিবেদক:
মোহাম্মদ ইলিয়াছ, নিয়োগ পেয়েছেন রাঙামাটির বরকল উপজেলার শুভলং ইউনিয়ন সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শক (এএইচআই) পদে। নিয়ম অনুযায়ি তিনি নবজাতক থেকে দুই বছরের শিশুদের টিকাদান কার্যক্রম পরিদর্শন করার কথা। এছাড়া বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে স্যানিটেশন বিষয়ে সচেনতনা সৃষ্টি এবং সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ঘোষিত বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে কাজ করা। তবে তিনি নিজ কর্ম ও কর্মস্থল ছেড়ে (নিজ বেতনে) ভারপ্রাপ্ত উপজেলা স্যানিটারি ইন্সপেক্টর হিসেবে ব্যস্ত সময় পাড় করছেন অন্যের চাকরিতে। গত দুই মাস ধরে ইলিয়াছ নিজ কর্মস্থলে অনপুস্থিত রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এরআগে একই পদে দায়িত্ব পালন করেছেন বরকল উপজেলা স্বাস্থ্য সহকারী শান্তি বিমল চাকমা।

নবজাতক থেকে দুই বছরের শিশুদের টিকাদানে ইপিআই টেকনিশিয়ান হিসেবে কাজ করার কথা থাকলেও তিনিও নিজ কর্মস্থল ও কর্ম ছেড়ে দুই বছর অধিক সময় কাটিয়েছেন অন্যের চাকরিতে। শান্তি বিমল চাকমা জানান, আর দুই মাস পরই অবসরকালিন ছুটিতে যাচ্ছেন। তাই উপজেলা ভারপ্রাপ্ত স্যানিটারি ইন্সপেক্টরের দায়িত্ব থেকে সরে গেছেন তিনি। এখন শুভলং ইউনিয়ন সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শক মোহাম্মদ ইলিয়াছ ভারপ্রাপ্ত উপজেলা স্যানিটারি ইন্সপেক্টর পদে দিয়েছেন।

যদিও খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বরকল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্যানিটারি ইন্সপেক্টর (এসআই) পদে কাগজে-কলমে সেলিম সালা উদ্দিন নামের এক ব্যক্তি রয়েছেন। উপজেলার নিরাপদ খাদ্য তদারকি, স্যানিটেশন কার্যক্রম পরিচালনা, স্যাম্পল কালেকশন, প্রসিকিউটর হয়ে প্রসিকিউশন দায়েরসহ নিয়মিত অভিযান বাস্তবায়ন না করে তিনিও নিজ কর্মস্থল ছেড়ে (নিজ বেতনে তথা উপজেলা স্যানিটারি ইন্সপেক্টরের নির্ধারিত বেতন-ভাতায়) দায়িত্ব পালন জেলার ভারপ্রাপ্ত স্যানিটারি ইন্সপেক্টর পদে।

রাঙামাটি জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের একাধিক সূত্র জানায়, স্যানিটারি ইন্সপেক্টর পদে নিয়োগ পেতে হলে সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগে স্বাস্থ্য সহকারী পদে তিন-পাঁচ বছর চাকরিকাল অতিবাহিত করা এবং তিন বছরের এসআইটি কোর্স উত্তীর্ণ হওয়া বাধ্যবাদকতা রয়েছে। এরপর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সুপারিশসহ আবেদনের ভিত্তিতে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ কর্তৃক অনুমতিসহ সরকারি গেজেটভুক্ত হওয়ারও বাধ্যকতা রয়েছে। এর বাইরে কারো স্যানিটারি ইন্সপেক্টর হওয়ার সুয়োগ নাই।

স্যানিটারি ইন্সপেক্টর নিয়োগের প্রক্রিয়া ও বিধি সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয় বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য অধিদপ্তরের চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত সচিব) জাকারিয়ার নিকট। তিনি বলেন, তিন-পাঁচ বছর স্বাস্থ্য সহকারী পদে চাকরিকাল অতিবাহিত ও তিন বছরের এসআইটি কোর্স উত্তীর্ণদের মধ্য থেকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সুপারিশকৃতদের যাচাই-বাছাই করে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ দায়িত্ব প্রাদন এবং গেজেটভুক্ত করে থাকে। এসআইটি কোর্স ছাড়া এই পদে কারো দায়িত্ব পালনের এখতিয়ার নেই।

অপরদিকে সহকারী রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের অধিনে স্বাস্থ্য বিভাগে এক যুগ আগে কম্পিউটার অপারেটর পদে নিয়োগপান মাছুমা খাতুন। ওই সময় নিয়োগপত্র হাতে পেয়েই তিনি জেলার কাউখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যোগদান করেন। তবে যোগদানের কিছু দিন পরই প্রেষণে চলে যান জেলা সদরের উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার কার্যালয়ে। গত ১৮মার্চ তাকে পদোন্নতি দিয়ে প্রধান সহকারী করা হয়েছে। এবার পদোন্নতি পেয়ে তিনি চলে এসেছেন জেলার সিভিল সার্জন কার্যালয়ে। সংশ্লিষ্টতের জানান, নিয়োগ পাওয়া মূল কর্মস্থলে চাকরি না করেও পদোন্নতি এবং জেলা সদরে অবস্থানের অদৃশ্য ক্ষমতায় কোনো ধরণের বেগপেতে হয়নি তাকে।

একইভাবে জেলার লংগদু উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে উপজেলা স্যানিটারি ইন্সপেক্টর হিসেবে পদোন্নতিপান সেলিম সালা উদ্দিন। সেখানে কিছুদিন চাকরি করার পর বদলী হয়ে চলে যান জেলা সদরের নিকটবর্তী বরকল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। অভিযোগ রয়েছে, সেলিম সালা উদ্দিন বরকল উপজেলায় যোগদানের কিছুদিনের মধ্যেই সংযুক্তিতে নিজ বেতনে (উপজেলা স্যানিটারি ইন্সপেক্টরের বেতনে) ভারপ্রাপ্ত জেলা স্যানিটারি ইন্সপেক্টর হিসেবে যোগদেন। তবে নিজ কর্মস্থল ছেড়ে অন্যের চাকরিতে ব্যস্ত থাকার কারণে জেলার বরকল উপজেলা স্যানিটারি ইন্সপেক্টর পদ শূন্য হয়ে পড়ে। আর এ সুযোগে এসআইটি কোর্স ছাড়া ও সরকারের নিরাপদ খাদ্য অধিপ্তরের অনুমতিবিহীন প্রথমে এক স্বাস্থ্য সহকারী ও পরে এক সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শককে নিজ বেতনে- ভারপ্রাপ্ত স্যানিটারি ইন্সপেক্টর হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন রাঙামাটির সিভিল সার্জন। সরকারি বিধি অনুযায়ি এই দুইজনের কারোই স্যানিটারি ইন্সপেক্টর পদে প্রসিকিউটর হয়ে প্রসিকিউশন দায়ের স্যাম্পল কালেকশন, বাদী মামলা দায়ের বা তদন্ত করে প্রতিবেদন দেয়ার কোন এখতিয়ার নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান জাকারিয়া এক প্রশ্নের জবাবে এই প্রতিবেদককে জানিয়েছেন।

অপরদিকে রাঙামাটি পৌরসভার স্যানিটারি ইন্সপেক্টরের দায়িত্ব পালন করছেন ফিরোজ আল মাহমুদ। যিনি ইতিপূর্বে এই পৌরসভার তিন নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০১২ সালে তিনি এই পৌরসভার স্যানিটারি ইন্সপেক্টর পদে যোগদেন। যদিও স্যানিটারি ইন্সপেক্টর পদে নিয়োগ পেতে হলে তিন বছরের এসআইটি কোর্স উত্তীর্ণসহ সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগে স্বাস্থ্য সহকারী পদে পদে তিন-পাঁচ বছর চাকরিকাল অতিবাহিত হওয়া বাধ্যবাদকতা রয়েছে। এছাড়া নিরাপদ খাদ্যকর্তৃপক্ষ কর্তৃক অনুমতিসহ সরকারি গেজেটভুক্ত হওয়াও বাধ্যকতা রয়েছে। তবে রাঙামাটি পৌরসভায় স্যানিটারি ইনসপেক্টর পদে নিয়োগ পাওয়া ফিরোজ আল মাহমুদ’র এসব কোনো যোগ্যতাই নাই বলে রাঙামাটি পৌর প্রশাসনের একাধিক সূত্র এই প্রতিবেদককে নিশ্চিত করেন। ফিরোজ আল মাহমুদ নিজেও এই প্রতিবেদকের নিকট বিষয়টি স্বীকার করেন। তিনি বলেন, রাঙামাটি পৌরসভায় ২০০৮ সালে প্রথমে স্বাস্থ্য সহকারী পদে নিয়োগ পান। ফিরোজ মাহমুদ ২০১২ সালে পদোন্নতি নিয়ে হয়ে যান পৌরসভার স্যানিটারি ইন্সপেক্টর।

অভিযোগ রয়েছে, শুধু মাছুমা খাতুন, সেলিম সালা উদ্দিন, বরকলের নিজ বেতনের স্যানিটারি ইন্সপেক্টর (স্বাস্থ্য সহকারী) শান্তি বিমল চাকমা ও (সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শক) মোহাম্মদ ইলিয়াছ বা পৌরসভার ফিরোজ আল মাহমুদ জিন্নাহ নয়, রাঙামাটি সিভিল সার্জন (সিএস) কার্যালয়ের প্রধান সহকারী নজরুল ইসলাম গত এক যুগের বেশি সময় ধরে বিধিবর্হিভুত নিয়োগ, পদায়ন, পদোন্নতিকে নিয়মে পরিনত এক বাণিজ্যে মেতে উঠেছেন। মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে জেলার স্বাস্থ্য বিভাগের বিভিন্ন উপজেলার স্বাস্থ্যকর্মী ও কর্মচারিদের সংযুক্তি, পদায়ন ও পদোন্নতি বাণিজ্য করে আসছেন তিনি। এর বাইরে বিভিন্ন কেনাকাটা ও টেন্ডার কারসাজি করে অবৈধ আয়ের মাধ্যমে জেলায় নামে-বেনামে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন। শুধুতাই নয় স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট অন্যসব বিভাগেও খবরদারি ও নিয়োগে রয়েছে তার সিদ্ধহস্ত। আর এসব অবৈধ কার্যকলাপে কারণে জেলার স্বাস্থ্য বিভাগে চরম বিশৃঙ্খলাসহ এক অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। সম্প্রতি তার নুরুল ইসলামের অবৈধ কর্মকাণ্ডের কারণে তাদের স্বামী-স্ত্রীকে উপজেলায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।

এই বিষয়ে জানতে রাঙামাটি সিভিল সার্জন ডাঃ নূয়েন খীসার ব্যক্তিগত ও অফিস মুঠোফোনে একাধিকবার কল দিয়েও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।


সম্পর্কিত খবর