
জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সব রাজনৈতিক দল অঙ্গীকারাবদ্ধ। তাদের পরিষ্কার করতে হবে তারা গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে নাকি ‘না’ ভোটের পক্ষে। অর্থাৎ সংস্কারের পক্ষে নাকি বিপক্ষে। অন্যদিকে নৌ পরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, অভ্যুত্থানের মাধ্যমে যারা ক্ষমতা থেকে বিতাড়িত হয়েছেন, তারা বসে নেই।
গতকাল বুধবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) আয়োজিত ‘গণভোট ২০২৬ : কী ও কেন?’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে সুজনের পক্ষ থেকে এমনটি জানানো হয়। গোলটেবিল বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন সুজনের সহ সভাপতি ও সাবেক বিচারপতি আব্দুল মতিন। এরপর গণভোটের সঙ্গে সম্পর্কিত সব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উপস্থাপন করা হয়। ‘হ্যাঁ’ ও ‘না’ ভোট বিষয়ে ৪টি প্রশ্নের ব্যাপারে বিস্তারিত ধারণা প্রদান করেন এবং জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।
বদিউল আলম দেখান, গণভোটের ১নং প্রশ্নে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা, নির্বাচন কমিশনে নিয়োগ, ন্যায়পাল নিয়োগ, সরকারি কর্মকমিশনে নিয়োগসহ ৬ বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ২নং প্রশ্নে আইনসভা গঠন, উচ্চকক্ষ গঠনসহ ৪টি বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ৩নং প্রশ্নে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা, প্রধানমন্ত্রীর পদের মেয়াদসহ ৩০টি বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এছাড়াও ৪নং প্রশ্নে ভাষা, নাগরিকদের পরিচয়, সংবিধান সংশোধনসহ ৮টি বিষয়ে আলোচনা করা হয়। প্রধান অতিথি ছিলেন শ্রম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত হোসেন বলেন, গণভোটের বিষয়ে গ্রাম পর্যায়ে এখনো পর্যাপ্ত সচেতনতা তৈরি হয়নি। এ ক্ষেত্রে সরকারের চেয়ে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এবার নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব শুধু নির্বাচন পরিচালনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। গণভোট কীভাবে হবে, সেটিও জনগণকে স্পষ্টভাবে জানাতে হবে।
কারণ, গণভোট আয়োজন ও পরিচালনার দায়িত্বও নির্বাচন কমিশনের ওপরই থাকবে। এম. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর মন-মানসিকতা কী? তারা কি আগের মতোই থাকতে চায়, নাকি পরিবর্তন হতে চায়, সে ধরনের কোনো সুস্পষ্ট বক্তব্য আমরা কোনো রাজনৈতিক দলের কাছ থেকে এখনো শুনিনি। যদিও একটি নতুন রাজনৈতিক দল, যারা এই অভ্যুত্থানের সঙ্গে যুক্ত ছিল এনসিপি, তাদের কাছ থেকে কিছু কথা শুনেছি, কিন্তু বড় রাজনৈতিক দলগুলো যারা ক্ষমতায় আসবে বা যাবে বলে মনে হচ্ছে তাদের কাছ থেকে সে ধরনের অঙ্গীকার এখনো পাইনি।
তিনি বলেন, ইতোমধ্যে আমিও আপনাদের মতো অনেক গুঞ্জন শুনছি। নানা ধরনের ক্যাম্পেইন চলছে। যারা বিতাড়িত হয়েছে তারা বসে নেই। তারা সব ধরনের প্রোপাগান্ডা চালাচ্ছে। তাদের কাছে টাকা-পয়সা আছে, বিদেশি মদদও আছে। নৌ পরিবহন উপদেষ্টা বলেন, আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি গণভোটের বিষয়ে নির্বাচন কমিশনকে মাঠে নামতে হবে। এর জন্য যে সহযোগিতা প্রয়োজন, সরকার তা অবশ্যই করবে। সরকার তো নির্বাচন দিতে চায়, এটাই আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য। গোলটেবিল বৈঠকের শুরুতে ‘গণভোট ২০২৬ : কী ও কেন?’ শীর্ষক একটি পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন উপস্থাপন করেন সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার।
উপস্থাপনের শুরুতেই তিনি গণভোটের প্রেক্ষাপট উপস্থাপন করেন। এরপর গণভোট আসলে কী, সেই বিষয়ে ধারণা দেন। জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোট কেন প্রয়োজন এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ দীর্ঘ আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে প্রণীত একটি রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল, যাতে দেশে বিদ্যমান সক্রিয় প্রায় সব দল সই করেছে। যেহেতু সংবিধান হলো ‘উইল অব দ্য পিপল’ বা জনগণের চরম অভিপ্রায়ের অভিব্যক্তি, তাই জুলাই সনদে অন্তর্ভুক্ত প্রস্তাবগুলো সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করতে জনগণের সম্মতি বা গণভোট আয়োজন করা প্রয়োজন। এটাই গণভোট। বদিউল আলম মজুমদার বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো জুলাই সনদ বাস্তবায়নে অঙ্গীকারাবদ্ধ। তারা এ ব্যাপারে অঙ্গীকার প্রদান করেছেন এবং সই করেছেন। তাদের এখান থেকে বেছে বেছে বাস্তবায়ন করার কোনো সুযোগ নেই। দলগুলোকে অবশ্যই তারা ‘হ্যাঁ’ নাকি ‘না’ ভোটের পক্ষে সেটা পরিষ্কার করতে হবে।
সবশেষে সুজনের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি কিছু প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয়। বদিউল আলম বলেন, নাগরিক হিসেবে আমরা আশা করি যে, রাজনৈতিক দলগুলো ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ বাস্তবায়নে তাদের অঙ্গীকারগুলো পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন করবে। তাদের কাছ থেকে অস্পষ্টতা বা বেছে বেছে গ্রহণযোগ্যতা আর গ্রহণযোগ্য নয়। আমরা চাই স্পষ্টতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি। জুলাই জাতীয় সনদ জনগণের রাজপথের আন্দোলন, বিপুল আত্মত্যাগ ও দীর্ঘদিনের বঞ্চনাপ্রসূত হতাশার বিপরীতে রাজপথের ঐক্যের প্রতীক হয়ে জন্ম নেয়া একটি সামাজিক চুক্তি। এর প্রতি আন্তরিক অঙ্গীকার ছাড়া গণতান্ত্রিক সমাজ বিনির্মাণ ও রাষ্ট্র পুনর্গঠন সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, জুলাই জাতীয় সনদের প্রস্তাবনাগুলো রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে সংস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করেছে। তাই, সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত ৪৮টি ইস্যুতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেগুলোর ওপর আসন্ন গণভোটে জনগণকে ‘হ্যাঁ’ নাকি ‘না’ ভোট দিতে আহ্বান করবে তা রাজনৈতিক দলগুলোকে স্পষ্ট করতে হবে। এছাড়া জুলাই সনদের অন্য ৩৬টি সংস্কার প্রস্তাব যেগুলো আইন বা বিধি কিংবা নির্বাহী আদেশে বাস্তবায়ন করা যাবে, সেগুলো বাস্তবায়নের ব্যাপারেও দলগুলোকে তাদের অবস্থান পরিষ্কার করতে হবে।
