
রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবিপ্রবি) প্রশাসনিক অন্দরে দীর্ঘদিনের জমে থাকা উত্তেজনা গত বুধবার (৭ জানুয়ারি) এক নাটকীয় রূপ নিয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে আয়োজিত শোকসভায় উপাচার্য ও প্রকল্প পরিচালকের মধ্যে নজিরবিহীন বাকবিতণ্ডা ও হট্টগোলের ঘটনা ঘটেছে। এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই ওই দিন রাতে প্রকল্প পরিচালক ও পরিকল্পনা, উন্নয়ন ও ওয়ার্কস দপ্তরের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক আব্দুল গফুরকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
শোকসভায় অডিও রেকর্ড ও হট্টগোল
গত বুধবার সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ভবন-১ এর সভাকক্ষে বেগম খালেদা জিয়ার স্মরণে শোকসভা ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার মো. জুনাইদ কবিরের সভাপতিত্বে ওই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উপাচার্য ড. আতিয়ার রহমান। সভার শেষ পর্যায়ে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেওয়ার সময় উপাচার্য ড. আতিয়ার রহমান উপস্থিত সবার সামনে সাউন্ড স্পিকারে একটি অডিও রেকর্ড বাজিয়ে শোনান। সেখানে প্রকল্প পরিচালক আব্দুল গফুরের সঙ্গে একজন সংবাদকর্মীর কথোপকথন শোনা যাচ্ছিল।
উপাচার্য দাবি করেন, তাঁর হাতে এমন পাঁচটি অডিও ক্লিপ এসেছে যা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থবিরোধী। সভাস্থলে উপস্থিত আব্দুল গফুর এ সময় উত্তেজিত হয়ে পড়েন এবং উপাচার্যের সঙ্গে তাঁর তুমুল বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে আব্দুল গফুর উপাচার্যকে অসৎ লোক হিসেবে আখ্যা দেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট একটি রাজনৈতিক মতাদর্শের লোকদের চাকরি দেওয়ার অভিযোগ তোলেন। পরে উপস্থিত কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত হয়।
সাময়িক বরখাস্ত ও কঠোর নিষেধাজ্ঞা
শোকসভার ওই উত্তপ্ত ঘটনার পর গত বুধবার রাতেই ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার মো. জুনাইদ কবিরের সই করা এক আদেশে আব্দুল গফুরকে সাময়িক বরখাস্তের কথা জানানো হয়। আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে, আব্দুল গফুরের বিরুদ্ধে আইসিটি সংক্রান্ত অপরাধ, শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ড, প্রশাসনে অস্থিরতা তৈরি, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম ক্ষুণ্ণ করার অপচেষ্টার অভিযোগ রয়েছে। রিজেন্ট বোর্ডের সভায় এসব অভিযোগ নিয়ে বিশদ আলোচনার পর সদস্যদের সম্মতিক্রমে তাঁকে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বরখাস্ত থাকাকালীন আব্দুল গফুর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অবস্থান বা অনুপ্রবেশ করতে পারবেন না এবং বিধি অনুযায়ী কেবল খোরপোষ ভাতা পাবেন।
এই সিদ্ধান্তের বিষয়ে কথা বলতে আব্দুল গফুরের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি এবং ক্ষুদে বার্তারও কোনো জবাব দেননি।
রিজেন্ট বোর্ডের সিদ্ধান্ত ও প্রেক্ষাপট
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, শোকসভা অনুষ্ঠানের আগেই বুধবার সকালে উপাচার্য রিজেন্ট বোর্ডের সদস্যদের নিয়ে সভা করেন। সেখানে আব্দুল গফুরের বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগ খতিয়ে দেখা হয়। প্রশাসনের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্থিরতা তৈরি ও শৃঙ্খলা ভঙ্গের প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ায় রিজেন্ট বোর্ড তাঁকে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেছিল। শোকসভায় হট্টগোলের ঘটনার পর রাতে আনুষ্ঠানিকভাবে বরখাস্তের চিঠি প্রকাশ করা হয়। সভায় উপস্থিত কর্মকর্তা ও শিক্ষকরা জানিয়েছেন, উপাচার্য যখন অডিও রেকর্ড বাজান, তখন আব্দুল গফুর দাঁড়িয়ে গিয়ে উপাচার্যের বিরুদ্ধে জামায়াত-শিবির ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ আনেন এবং উত্তেজিত হয়ে পড়েন। এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সামাল দিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা রক্ষায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
সচিবালয়ে পাল্টা অভিযোগ আব্দুল গফুরের
চাকরি থেকে বরখাস্ত হওয়ার পরদিন বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) আব্দুল গফুর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব এবং বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন। ওই অভিযোগে তিনি উপাচার্য ড. আতিয়ার রহমানের বিরুদ্ধে অবৈধ ও নিয়মবহির্ভূতভাবে বরখাস্তের আদেশ দেওয়ার দাবি তুলেছেন। আব্দুল গফুর নিজেকে খাগড়াছড়ির মহালছড়ি উপজেলা ছাত্রদলের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক পরিচয় দিয়ে উপাচার্যকে ‘জামায়াত ঘরানার লোক’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
তাঁর দাবি, উপাচার্য হিংসার বশবর্তী হয়ে এই পদক্ষেপ নিয়েছেন। অভিযোগে তিনি আরও উল্লেখ করেন, উপাচার্য স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির মাধ্যমে ২১ জন জামায়াত-শিবির ঘরানার শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছেন এবং নিয়োগ পাওয়া কোনো কর্মকর্তাই পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসী নন।
উপাচার্যের কড়া জবাব ও দুর্নীতির অভিযোগ
আব্দুল গফুরের তোলা সব অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন উপাচার্য ড. আতিয়ার রহমান। তিনি জানান, আব্দুল গফুরের শিক্ষাজীবনে দুটি তৃতীয় বিভাগ রয়েছে এবং তিনি একজন চরম দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তি।
উপাচার্য ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আব্দুল গফুরের চুলের আগা থেকে পায়ের তলা পর্যন্ত শুধু দুর্নীতি আর দুর্নীতি। তিনি আগে নিজেকে আওয়ামী লীগের লোক দাবি করলেও এখন ভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয় দিচ্ছেন। শিক্ষক নিয়োগ প্রসঙ্গে উপাচার্য বলেন, পার্বত্য অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য ২৪ শতাংশ কোটা নিশ্চিত করা হলেও শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো আঞ্চলিক কোটা নেই, নিয়োগ দেওয়া হয়েছে মেধার ভিত্তিতে।
আব্দুল গফুরকে একজন চরম দুর্নীতিবাজ হিসেবে উল্লেখ করে উপাচার্য জানান, রিজেন্ট বোর্ডের সিদ্ধান্তে তাঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করার প্রস্তুতি চলছে এবং কোনো বিনিময়ই তিনি পার পাবেন না।
নিয়োগ ও কোটা নিয়ে বিতর্ক
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের তথ্যমতে, আব্দুল গফুর অভিযোগ করেছেন যে পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষকে উপেক্ষা করে উপাচার্য নিয়োগ বাণিজ্য করেছেন। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সব নিয়োগ নিয়ম মেনেই করা হয়েছে। আব্দুল গফুর তাঁর অভিযোগে ২২ জন শিক্ষকের মধ্যে ২১ জনকে উপাচার্যের নিজের মতাদর্শের লোক বলে দাবি করলেও উপাচার্য স্পষ্ট জানিয়েছেন যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগে কোনো দলের আদর্শ বিবেচনা করা হয় না। এ ছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসী না হওয়ার যে অভিযোগ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আনা হয়েছে, সে বিষয়েও উপাচার্য বলেন যে নিয়ম অনুযায়ীই সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে এই দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে প্রশাসনিক পর্যায়ে চাঞ্চল্য বিরাজ করছে।
