
অদৃশ্য শক্তিতে এখনও রেলের টেন্ডার, ইজারা ও দখল বাণিজ্য
চট্টগ্রামের রেলের ‘গডফাদার’ পরিচিত শাহ আলম। এক সময় যুবদল রাজনীতি সঙ্গে যুক্ত থাকলেও গত আওয়ামী লীগ সরকারের পুরো সময়জুড়ে ভোল্ট পাল্টে যুবলীগ নেতাদের সিন্ডিকেটের আশ্রয় নেন তিনি। ওই আওয়ামী লীগ, যুবলীগ সহ দলটির বিভিন্ন কর্মসূচিতে সক্রিয় অংশগ্রহণের পাশাপাশি বড় অঙ্কের আর্থিক অনুদানও দিয়েছিলেন। নিজ বাড়ি কুমিল্লায় হলেও নগরের পূর্ব মাদারবাড়িতে তার বেড়ে উঠা। বিগত জোট সরকারের আমলে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী দুবাই ফেরত ‘রেলখোকো’ হেলাল আকবর চৌধুরী ওরফে বাবর ও ভারতে পলাতক চট্টগ্রামের ত্রাস সুনীলদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করেন। এই সম্পর্কের জোরে রেলের টেন্ডার, ইজারা ও দখল বাণিজ্য একচেটিয়াভাবে বাগিয়ে নেন রেলের এই প্রভাবশালী ঠিকাদার।
আওয়ামী লীগের প্রভাব ও সন্ত্রাসীদের প্রভাব বিস্তার করে রেলে যা চাইতেন তাই পেতেন এই শাহ আলম। একচেটিয়াভাবে রেলের বড় বড় টেন্ডার, তার স্ত্রী ইয়াসমিন আলমের নামে রেলের জায়গায় রেস্টুরেন্ট, আইস ফ্যাক্টরি রোডে জমি ভাড়া নিয়ে এককালীন বিক্রি, হালিশহরে ১২ একর জলাশয় ইজারা নিয়ে বিশাল বাগানবাড়ি, চট্টগ্রাম পুরাতন রেলস্টেশনের হোটেল হেরিটেজ ইজারা, কুমিল্লা রেলস্টেশনে দোকানপাট, সবকিছুতেই তার নিয়ন্ত্রণ ছিল। এছাড়া পাহাড়িকা ও উদয়ন ট্রেনের খাবার সরবরাহের ঠিকাদারিও তার দখলে।
অভিযোগ আছে, এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে রেলের প্রধান প্রকৌশলীসহ সিআরবির কিছু অসৎ কর্মকর্তার যোগসাজশে রেলওয়ের টেন্ডার, ইজারা, দখল বাণিজ্য ও তদবির বাণিজ্য পরিচালিত হয়। ভুয়া অভিজ্ঞতার সনদ দিয়ে প্রভাব খাটিয়ে রেল সচিবালয় ভবন ও পদ্মা রেল প্রজেক্টের মতো স্পর্শকাতর প্রকল্পের কাজও বাগিয়ে নিয়েছে এই চক্রে জড়িত অদক্ষ ঠিকাদাররা। রেলের নিজস্ব নকশা ও কৌশল শিখিয়ে ইজারা ফরমেট তৈরি করে ইজারা বাগিয়ে নেওয়া হয়। রেলের ঠিকাদারদের কাছে শাহ আলম আতঙ্কের নাম। তার অনুমতি ছাড়া কেউ টেন্ডার জমা দেওয়ার সাহস করে না, ভুল করে এগিয়ে গেলে চরম বিপদের শঙ্কা থাকে।
যেভাবে বাগিয়ে নেন স্ত্রীর নামে রেস্টুরেন্টের জমি:
শাহ আলমের কথা বললেই এক শ্রেণীর রেল অসৎ কর্মকর্তাদের মধ্যে ভীতি কাজ করে। চট্টগ্রাম রেলওয়ে হাসপাতালের প্রধান ফটকের দক্ষিণ পাশে, সিআরবি এলাকা সংলগ্ন প্রায় ৬ হাজার বর্গফুট রেলভূমির ওপর ‘তাসফিয়া গার্ডেন’ নামে একটি রেস্টুরেন্ট নির্মাণ করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে এই লাইসেন্স নেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি ইয়াসমিন আলমের নামে হলেও এর কার্যক্রম পরিচালনা করেন শাহ আলম। তার বিরুদ্ধে অতীতে রেলওয়ের জমি দখলের অভিযোগও রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
এ ঘটনায় চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সাবেক সহসভাপতি মো. জাফর হায়দার রেলওয়ের মহাপরিচালকের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগে বলা হয়, সিআরবি এলাকা সংলগ্ন প্রায় ৬ হাজার বর্গফুট রেলভূমির ওপর রেস্টুরেন্টটি নির্মাণ করা হয়েছে এবং জমিটি অবৈধভাবে দখল করে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে লাইসেন্স নেওয়া হয়েছে। অভিযোগের প্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপককে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে এখনো পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এই জায়গায় সরকারি একটি হাসপাতাল হওয়ার কথা ছিল। ‘তাসফিয়া গার্ডেন’ ভেঙে যেতে পারে, এমন আশঙ্কায় সেখানে বাধা দেয় শাহ আলমের সিন্ডিকেট। ‘পেইড লোকজন’ দিয়ে নিয়মিত প্রতিবাদ সমাবেশ করিয়ে শেষ পর্যন্ত সরকারকে সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে বাধ্য করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া রেস্টুরেন্টটিতে নিয়মিত উচ্চ শব্দে গান-বাজনা ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়, যা পাশের হাসপাতালের রোগীদের জন্য ভোগান্তির কারণ হতে পারে।
ইজারা ও দখল বাণিজ্য:
জানা গেছে, ২০১৮ সালের শেষের দিকে চট্টগ্রাম নগরীর আইসফ্যাক্টরি রোডে রেলের কাছ থেকে এক বছরের জন্য দুই দশমিক তিন একর জমি লিজ নেন তিনি। আইস ফ্যাক্টরি রোড ব্যবসায়ী সমিতি লি. ও চুনারগুদাম ট্রাক মালিক সমবায় সমিতি লি.-এর নামে মূল্যবান জমি এক বছরের জন্য লিজের লাইসেন্স নেওয়া হয়। দুটি সমিতির সভাপতি জহির আহমদ চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক শাহ আলম। ৩৯ লাখ ১৮০ টাকায় নেওয়া এই জমির লিজের বরাদ্দের আশেপাশে আরও এক দশমিক ৬৮ একর জমি দখলে নিয়ে শক্ত স্থাপনায় গড়ে তোলেন ‘শাহ আমানত রেলওয়ে সুপার মার্কেট’।
প্রতিটি দোকান দীর্ঘমেয়াদী চুক্তিতে বিক্রি করা হয়। একাধিক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, কোনোটি ১৫ লাখ, কোনোটি ২০ লাখ, আবার কোনোটি ২৫ লাখ টাকায় দীর্ঘমেয়াদী চুক্তিতে দোকান কিনেছেন তারা। সেখানে ২৭০টি দোকান বানিয়ে প্রায় অর্ধশত কোটি টাকা ‘সালামির’ বিনিময়ে বিক্রি করা হয়।
বিষয়ে জানতে চাইলে অকপটে স্বীকার করেন শাহ আলম। তিনি একাধিক গণমাধ্যমকে বলেন, লিজের শর্ত মেনেই শাহ আমানত মার্কেট তৈরি করা হয়েছে। এত বড় মার্কেট একার পক্ষে করা সম্ভব নয় বলে একটি ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে এটি নির্মাণ করা হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদী দোকান বিক্রির বিষয়ে তিনি বলেন, জমিটি এক বছরের লিজ, এ কথা ক্রেতাদের আগে থেকেই জানানো হয়েছে। তারা সবকিছু জেনেশুনেই নিয়েছেন। রেল সন্তুষ্ট থাকলে মেয়াদ শেষে লিজ নবায়ন করা সম্ভব।
অভিযোগ রয়েছে, চট্টগ্রাম পুরোনো রেলওয়ে স্টেশনের হোটেল হেরিটেজ প্রায় ১০ বছর ধরে দখলে রেখেছেন তিনি। চট্টগ্রাম ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের একটি ফ্লোর কম মূল্যে ইজারা নিয়ে উচ্চমূল্যে তৃতীয় পক্ষকে ভাড়া দিয়ে মোটা অঙ্কের অর্থ আয় করছেন। চট্টগ্রাম নতুন রেল স্টেশনের ১ হাজার গাড়ি ধারণক্ষমতার পার্কিং ইজারা নিয়ে ৬ বছর ধরে দখলে রেখেছেন। হালিশহর এলাকায় রেলের প্রায় ৫০০ কোটি টাকা মূল্যের ১২ একর জমি দখল করে বিশাল বাগানবাড়ি তৈরি করেছেন।
এ ছাড়া চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনের সব দোকান ইজারা নিয়ে তৃতীয় পক্ষকে ভাড়া দিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন শাহ আলম ও তার লোকজন। নতুন স্টেশনের দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলার গেস্টহাউজও শাহ আলম সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে। চট্টগ্রাম নতুন স্টেশন এলাকায় ৭০-৮০ হাজার বর্গফুটের দুটি পার্কিং লিজ নেওয়ার পর মেয়াদ শেষ হলেও রেলওয়ের নীতিমালা লঙ্ঘন করে মামলার মাধ্যমে অবৈধভাবে দখলে রাখার অভিযোগ রয়েছে।
অনুসন্ধানে রেলের প্রাপ্ত নথিপত্র থেকে জানা যায়, এই চক্রে জড়িত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে শাহ আলমের মালিকানাধীন এসএ করপোরেশন ও ইউনিক ট্রেডার্স, নওফেল আহমেদের মেসার্স হাইটেক কনস্ট্রাকশন লিমিটেড এবং মো. বিল্লাল হোসেন (বেলাল হুজুর নামে পরিচিত)-এর মোহাম্মদী ইঞ্জিনিয়ারিং ও ইউনিকন লিমিটেড। ২০১৯ সালের আগে এসব প্রতিষ্ঠানের কোনো নির্মাণ অভিজ্ঞতা না থাকলেও ২০২০-২০২১ ও ২০২১-২০২২ অর্থবছরে ভুয়া অভিজ্ঞতার সনদ দিয়ে কোটি কোটি টাকার কাজ বাগিয়ে নেয়।
রেলওয়ের একটি ডিভিশন (ডিএন-৩) এর সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে চুক্তিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, সিন্ডিকেটভুক্ত চট্টগ্রামের ছয়টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান গত দুই বছরে ঢাকার অন্তত ১১টি কাজ বাগিয়ে নিয়েছে। এর মধ্যে তমা কনস্ট্রাকশন রেল সচিবালয় ভবনের ৯ম ও ১০ম তলার ১৭ কোটি ৪৮ লাখ টাকার কাজ এবং পদ্মা রেল লিংক প্রকল্পের ১ কোটি ৬৪ লাখ টাকার কাজও পেয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, অসৎ কর্মকর্তাদের যোগসাজশে রেল ভবনের কাজের বরাদ্দ দ্বিগুণ বাড়িয়ে ৩৩ কোটি টাকা করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, নিজেদের প্রতিষ্ঠানের বাইরে অন্যদের কাজ পাইয়ে দিতেও এই সিন্ডিকেট। এক্ষেত্রে কাজ পেতে ঠিকাদারদের ১০ শতাংশ কমিশন দিতে হয়। এর মধ্যে কাজভেদে ২-৫ শতাংশ প্রধান প্রকৌশলী, ২ শতাংশ জেনারেল ম্যানেজার এবং ১ শতাংশ অর্থ ডিএনকে (ডিভিশনাল চিফ) দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। বাকি অর্থ যায় সিন্ডিকেটের হোতাদের কাছে।
চট্টগ্রামে দুদক সূত্র জানায়, আইসফ্যাক্টরি রোডে খুবই কম মূল্যে ইজারা দেওয়া হয়েছে এবং নিয়ম না মেনে সেখানে মার্কেট নির্মাণ করা হয়েছে। এ ঘটনায় মামলা হয়েছে, যা বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চট্টগ্রাম পূর্বাঞ্চলের রেলের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, শাহ আলমের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে মন্ত্রণালয়ে অনেক অভিযোগ জমা পড়েছে। নিয়ম না মেনে যা কিছু করা হয়েছে, সবকিছুই খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
