
মোছাদ্দেক হোসাইন, লোহাগাড়া :
লোহাগাড়ায় সড়ক দুর্ঘটনার হট স্পট হিসেবে পরিচিত চুনতির জাঙ্গালিয়া এলাকা। চট্টগ্রাম–কক্সবাজার মহাসড়কে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটে লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি ইউনিয়নের জাঙ্গালিয়ায়। প্রতিদিন ঘটছে দূর্ঘটনা, মৃত্যুর মিছিল দিন দিন লম্বাই হচ্ছে। গত ৩দিনে প্রাণ গেছে ১৬ জনের।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ওইস্থানে সড়কের দুইপাশে ঘন বনাঞ্চল, ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক, বেপরোয়া গতি, লবণ পানিতে পিচ্ছিল সড়ক ও ঢালু রাস্তা দুর্ঘটনার কিছু অন্যতম কারণ।
গত তিন মাসে ঐ স্তানে দূর্ঘটনা ঘটে ছোট বড় প্রায় ১৮টি। তার মধ্যে ঈদের দিন সকালে দুই যাত্রীবাহী বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত পাঁচ জন, ঈদের দ্বিতীয় দিন দুই মাক্রোবাস মুখোমুখি সংঘর্ষে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে ৮ জন আহত ও একজন নিহত হন। ঈদের তৃতীয় দিন বাস এবং মাইক্রোবাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহতের সংখ্যা ১০ এবং আহত অনেক।
বুধবারের (২ এপ্রিল) ঘটনায় প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বুধবার সকাল ৭টার দিকে মহাসড়কের চুনতি জাঙ্গালিয়া এলাকায় বন কর্মকর্তার কার্যালয়ের সামনে চট্টগ্রামগামী বেপরোয়া গতির বাসের সঙ্গে কক্সবাজারগামী মাইক্রোবাসটির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়।
দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলেই সাতজন নিহত হয়েছেন। এরপর উপজেলার পদুয়ার একটি বেসরকারি হাসপাতালে আরও একজনের মৃত্যু হয়। পরে আশঙ্কাজনক অবস্থায় পাঁচ জনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে নেওয়া হলে তাদের মধ্যে দুইজনের মৃত্যু হয়।
ঘটনাস্থলে নিহতদের মধ্যে তিন নারী, তিন পুরুষ ও একটি শিশু রয়েছে।
এ দুর্ঘটনার কারণে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে ঘণ্টাখানেক যান চলাচল বন্ধ ছিল। পরে দোহাজারী হাইওয়ে পুলিশ, লোহাগাড়া ফায়ার সার্ভিস, লোহাগাড়া থানা পুলিশের চেষ্টায় যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অপ্রশস্ত সড়ক, বিপজ্জনক বাঁক, বেপরোয়া গতি, ওভারটেকিং, অপ্রশিক্ষিত চালক, লবণ পানিতে মহাসড়ক পিচ্ছিল, গাড়ির এলইডি হেডলাইটের আলো, মহাসড়কে নিষিদ্ধ ছোট যানবাহন চলাচল, ধারণ ক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত ওজন নিয়ে চলাচল ও সড়কে দুই পাশে অসমান অংশসহ কয়েকটি কারণে এই সড়কে দুর্ঘটনা ঘটছে বেশি। বিশেষ করে দূর–দূরান্ত থেকে আসা চালকদের এই সড়কের ব্যাপারে অভিজ্ঞতা না থাকায় দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। এছাড়া নেই কোনো সচেতনতামূলক সাইনবোর্ডও।
এছাড়াও জানা যায়, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের মইজ্যারটেক থেকে লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি ইউনিয়নের জাঙ্গালিয়া এলাকা পর্যন্ত ৬৬ কিলোমিটার দেখভাল করে দোহাজারী সড়ক ও জনপদ (সওজ) বিভাগ। সরেজমিন দেখা যায়, প্রতি বছর সংস্কার করতে গিয়ে সড়কের দুই পাশ দেড় থেকে দুই ফুট পর্যন্ত অসমতল হয়ে পড়েছে।
চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের লোহাগাড়া অংশে ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক রয়েছে ১০টিরও বেশি। এছাড়া সড়কের দুই পাশে রয়েছে অনেকগুলো হাট বাজার। এই হাটবাজারে যানজটের কারণে বিভিন্ন সময় মহাসড়কের লোহাগাড়া সদর বটতলী স্টেশন, পদুয়া তেওয়ারীহাট, আধুনগর খানহাট বাজার ও চুনতি বাজার এলাকায় প্রায় সময় যানজট লেগেই থাকে।

এদিকে, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের মৃত্যুকূপ হিসেবে পরিচিত চুনতি জাঙ্গালিয়া এলাকা পরিদর্শন করেছেন দূর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফারুক ই আজম।
তিনি বলেন, জাঙ্গালিয়া দুর্ঘটনায় আহতদের সুচিকিৎসার পাশাপাশি আহতদেরকে বিআরটিএ ট্রাস্টি বোর্ডের পক্ষ থেকে তিন লাখ টাকা ও নিহতদের পরিবারকে ৫ লাখ টাকা সহায়তা দেওয়া হবে। এছাড়াও সরকারের পক্ষ থেকে নিহতদের পরিবারকে ৫০ হাজার টাকা ও আহতদের ১৫ হাজার টাকা করে দেওয়া হবে।
তিনি আরো বলেন, অতি শিগগিরই চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ককে চারলেনে উন্নীত করা হবে। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাছাড়া কাল থেকে সড়কের উভয়দিকে এক কিলোমিটারের মধ্যে গতিরোধক স্থাপনের কাজ শুরু হবে।
এ সময় অন্যদের মধ্যে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম, লোহাগাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. ইনামুল হাসান, লোহাগাড়া থানার ওসি আরিফুর রহমান, সড়ক ও জনপদ চট্টগ্রাম দক্ষিণের বিভাগীয় প্রকৌশলী আব্দুল্লাহ আল নোমান পারভেজ, বিআরটিএ চট্টগ্রাম বিভাগের উপ-পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ার) সৈয়দ আইনুল হুদা চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন।

এলাকাটি পরিদর্শন করতে গিয়ে চট্টগ্রাম মহানগর আমীর শাহজাহান চৌধুরী বলেন, আমাদের দেশে চালক ভাইয়ারা অল্প শিক্ষিত হওয়ার কারণে অনেক কিছু বুঝেনা, তাদের সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য বাস এবং পরিবহন মালিক ভাইদের কাজ করতে হবে। গাড়ির গতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এতে করে দূর্ঘটনা অনেকটা কমবে। সড়ক প্রসস্থকরনের বিষয়েও দায়িত্বশীলদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি।

এছাড়াও আরকান সড়ক চার লাইনে উন্নিত করার দাবিতে মহাসড়কের বিভিন্ন জায়গায় মানববন্ধন করেছে জামায়াতে ইসলামী আধুনগর ও চুনতী ইউনিয়ন শাখা। এতে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা জামায়াতের নায়েবে আমীর প্রফেসর ড. হেলাল উদ্দিন মোহাম্মদ নোমান, বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সহ সম্পাদক এস এম লুৎফর রহমান, লোহাগাড়া উপজেলা জামায়াতের আমীর অধ্যাপক আসাদুল্লাহ ইসলামাবাদীসহ স্থানীয় শতশত নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন।
