বৃহস্পতিবার , ২৬শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

অপরাধ

রেলের ট্যাম্পিং ও রক্ষণাবেক্ষণের নামে অর্ধকোটি টাকা আত্মসাত!

বাংলাদেশ রেলওয়ের ট্যাম্পিং ও রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রমে বড় ধরনের অনিয়ম-দুর্নীতি অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের ২০১৯-২১ অর্থবছরে সম্পন্ন হওয়া রেল লাইনের ট্যাম্পিং কাজের ক্ষেত্রে চুক্তি বাস্তবায়ন, ভাড়া নির্ধারণ ও আর্থিক লেনদেন প্রক্রিয়ায় অসংগতি এবং সরকারি অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ পেয়েছে বাংলাদেশ মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিজিএ) দপ্তর।

সিজিএ’র তথ্য অনুযায়ী, রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ সুবক্তগীনের সরাসরি অনিয়ম-দুর্নীতি, অবহেলা ও দায়িত্বহীনতার কারণে সরকার প্রায় অর্ধকোটি টাকার রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হয়েছে বলে সিজিএ সূত্রে জানা গেছে। এই অনিয়মের কেন্দ্রে ছিল রেলওয়ের ট্যাম্পিং কাজ, যা রেললাইনকে স্থিতিশীল, নিরাপদ ও চলাচলযোগ্য রাখার জন্য অপরিহার্য।

রেলওয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, রেলওয়ে স্ট্যাম্পিং বলতে মূলত রেললাইনের নিচের ব্যালাস্ট বা পাথরগুলোকে কম্প্যাক্ট ও সঠিক স্থানে বসানোর কাজকে বোঝানো হয়, যা ট্র্যাকের স্থায়িত্ব, সমতলতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে, এটি একটি বিশেষ “ট্যাম্পিং মেশিন” ব্যবহার করে করা হয় যা পাথরগুলোকে শক্ত করে বসিয়ে ট্রেন চলাচলের ঝাঁকুনি কমায়, লাইনকে মজবুত ও নিরাপদ রাখে, এবং রক্ষণাবেক্ষণের সময় কমায়।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৯-২০২১ এই দুই অর্থবছরে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলে সম্পাদিত একাধিক চুক্তিতে “Employer Risk Portion”  দেখিয়ে ঠিকাদারকে বিনামূল্যে ট্যাম্পিং মেশিন সরবরাহ করা হয়। অথচ একই সময়ে অন্য প্রকল্পে প্রতি কিলোমিটার ট্যাম্পিং ভাড়া ধরা হয়েছিল ৪০ হাজার টাকা। এটি কেবল নিয়ম লঙ্ঘন নয়, বরং সরকারি সম্পদের অপব্যবহার বলেও উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

রেলওয়ের নিজস্ব সিডিউল (এসআর-২০১৩) অনুযায়ী ৩০ হাজার টাকা হারে ভাড়া প্রাক্কলনে অন্তর্ভুক্ত করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু সুবক্তগীনের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত প্রকল্পে সেই নিয়ম উপেক্ষা করা হয়। এবং ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে বিনা খরচে মেশিন ব্যবহারের সুযোগ দিয়ে সরাসরি আর্থিক সুবিধা প্রদান করা হয়েছে, এবং রাষ্ট্রের রাজস্ব ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে।

রেলওয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং কোডের ধারা ১০৩ অনুসারে, বিভাগীয় ব্যয়ের পূর্ণ দায়ভার সংশ্লিষ্ট প্রধান প্রকৌশলীর ওপর বর্তায়। কিন্তু সুবক্তগীন সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছেন। বরং তাঁর প্রশাসনিক অনুমোদনেই অনিয়মিত চুক্তিপত্র কার্যকর হয়েছে, যা নিরীক্ষকদের মতে অর্থনৈতিক জবাবদিহিতার চরম লঙ্ঘন।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, চুক্তি সম্পাদনের ক্ষেত্রে ট্যাম্পিং মেশিন ভাড়া অন্তর্ভুক্ত না করে সরকারকে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে, যা সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনার নীতিবিরুদ্ধ এবং সুস্পষ্ট অনিয়ম।

প্রাপ্ত নথি অনুযায়ী, Advance Rail Track Solution Bangladesh Limited এবং Alahee International  নামের একই ব্যবসায়িক গ্রুপের মালিকানাধীন দুটি প্রতিষ্ঠান বারবার একাধিক চুক্তি পেয়েছে। এতে দরপত্র প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতামূলক নীতির প্রশ্ন উঠেছে।

একই প্রতিষ্ঠান বারবার কাজ পাওয়ার পেছনে রেলওয়ের কিছু প্রভাবশালী কর্মকর্তার ভূমিকা ছিল বলেও অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, ওই প্রতিষ্ঠানগুলো কাজের তুলনায় অতিরিক্ত বিল উত্তোলন করেছে, যেখানে বাস্তব কাজের পরিমাণ ছিল ন্যূনতম। রেলওয়ের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বেশ কয়েকটি প্রকল্পের ব্যয়ের অস্বাভাবিক পার্থক্য তুলে ধরা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, এক চুক্তিতে ২২ লাখ টাকার বেশি খরচ দেখানো হলেও প্রকৃত কাজ হয়েছে মাত্র ১৯.৬৫০ কিলোমিটার। আরেকটি চুক্তিতে ৯৮.৮৮ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হলেও মাঠপর্যায়ে কোনো রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রমের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে যাত্রী ও স্থানীয়দের অভিযোগ, রেললাইনের পুরনো সমস্যা, ঘন ঘন ট্রেন বিলম্ব ও দুর্ঘটনা আগের মতোই রয়ে গেছে। কাজেই প্রশ্ন উঠেছে, যদি এত বিপুল অর্থ খরচ হয়, তাহলে পরিবর্তন কোথায়? প্রতিটি চুক্তিতে ৩০ হাজার টাকা হারে অগ্রিম বিল প্রদান করা হলেও কাজের প্রকৃত মূল্যায়ন করা হয়নি।

নিরীক্ষকরা মনে করেন, কাগজে-কলমে রক্ষণাবেক্ষণের নামে কোটি কোটি টাকা বিল উত্তোলন করা হয়েছে, কিন্তু বাস্তবে সেই কাজের অস্তিত্ব নেই। এই প্রেক্ষাপটে নিরীক্ষা বিভাগ বলেছে, চুক্তি বাস্তবায়নে যথাযথ মূল্যায়ন না হওয়ায় সরকারি অর্থ অপচয় হয়েছে। এই দায়ভার সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীর ওপর বর্তাবে এবং ক্ষতিপূরণ আদায়ের প্রয়োজন রয়েছে।

সরকারি তহবিল থেকে কোটি টাকার অপচয়ের ঘটনায় রেলওয়ে প্রশাসনও বিব্রত। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, ইতোমধ্যে বিষয়টি উচ্চ পর্যায়ে গিয়েছে এবং প্রধান প্রকৌশলী সুবক্তগীনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্তের সুপারিশ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সিজিএ’র এক কর্মকর্তা  জানান, রেলের ট্যাম্পিং ও রক্ষণাবেক্ষণ প্রকল্পে ঠিকাদারের সঙ্গে যোগাসাজসে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী সুবক্তগীন টাকা আত্মসাত করেছেন কিনা তদন্তে উঠে আসবে, তিনি হয়তো ফেঁসে যেতে পারেন, এই বিষয়ে এখন মন্তব্য করতে চাই না।

এবিষয়ে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী বর্তমানে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের জিএম সুবক্তগীনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কল রিসিভ করেনি।

#সূত্র, এসএস/জেএমএইচ


সম্পর্কিত খবর