অপরাধ

ভ্রাম্যমান আদালতে প্রসিকিউশন অফিসার কম্পিউটার অপারেটর

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) স্বাস্থ্য বিভাগে দায়িত্ব বণ্টন নিয়ে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। চসিকের স্বাস্থ্য সহকারী পদে কর্মরত সাতজনকে স্বাস্থ্য পরিদর্শকের ‘চলতি দায়িত্ব’ দেওয়া হয়েছে, যদিও সংশ্লিষ্টদের কয়েকজন স্বাস্থ্য সহকারী পদে স্থায়ী হয়েছেন দুই বছর অতিক্রম হয়নি। অথচ স্বাস্থ্য পরিদর্শক পদে পদোন্নতির জন্য নির্ধারিত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার শর্ত পূরণ না করেই এমন দায়িত্ব দেওয়ার ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে- সরকারি গেজেটে প্রকাশিত চাকরি বিধিমালা কি চসিকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়? বিষয়টি আরও গুরুতর হয়েছে মোবাইল কোর্টে প্রসিকিউশন অফিসারের দায়িত্ব দেওয়ার ঘটনায়। অফিস আদেশে স্বাস্থ্য পরিদর্শক (চলতি দায়িত্ব) হিসেবে উল্লেখ করে একজন কম্পিউটার অপারেটরকেও এ দায়িত্ব দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। পরে বিতর্কের মুখে ওই আদেশ বাতিল করে সংশোধিত আদেশ দেওয়ার কথা জানিয়েছে চসিক কর্তৃপক্ষ। কিন্তু একটি প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি- যে বিধিমালায় স্বাস্থ্য পরিদর্শক হওয়ার জন্য স্পষ্ট যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও পদোন্নতির পথ নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে, সেই বিধিমালা পাশ কাটিয়ে প্রথমে এমন আদেশ জারি হলো কীভাবে?

বিধিমালায় সাত বছরের অভিজ্ঞতা বাধ্যতামূলক
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন কর্মচারী চাকরি বিধিমালা, ২০১৯-এর ৬৯ নম্বর তফশিল স্বাস্থ্য পরিদর্শক পদে নিয়োগ ও পদোন্নতির যোগ্যতা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করেছে। বিধিমালা অনুযায়ী, স্বাস্থ্য পরিদর্শক পদের ৩৩ শতাংশ পদ পদোন্নতির মাধ্যমে এবং ৬৭ শতাংশ পদ সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে পূরণ করার বিধান রয়েছে। পদোন্নতির ক্ষেত্রে শুধু স্বাস্থ্য সহকারী হলেই হবে না। প্রার্থীকে চসিকের স্বাস্থ্য সহকারী অথবা পরিবার পরিকল্পনা কল্যাণকর্মী পদে স্থায়ী হয়ে কমপক্ষে সাত বছরের চাকরির অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হবে। একই সঙ্গে স্বীকৃত বোর্ড থেকে উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট বা সমমানের শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান থেকে মেডিকেল টেকনোলজি (স্যানিটারি ইন্সপেক্টরশিপ) বিষয়ে তিন বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা থাকতে হবে। অর্থাৎ একজন স্বাস্থ্য সহকারী সাত বছর চাকরি করলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্বাস্থ্য পরিদর্শক হওয়ার যোগ্য হয়ে যান না। সাত বছরের চাকরির অভিজ্ঞতার সঙ্গে নির্ধারিত শিক্ষাগত যোগ্যতা ও তিন বছর মেয়াদি স্যানিটারি ইন্সপেক্টরশিপ ডিপ্লোমাও থাকতে হবে। এরপর পদোন্নতির জন্য নির্ধারিত ৩৩ শতাংশ কোটায় পদ শূন্য থাকা এবং বিধি অনুযায়ী পদোন্নতির প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার বিষয়টিও প্রাসঙ্গিক। অন্যদিকে সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক বা সমমানের ডিগ্রি এবং একইভাবে তিন বছর মেয়াদি স্যানিটারি ইন্সপেক্টরশিপ ডিপ্লোমা বাধ্যতামূলক। ফলে বিধিমালার কাঠামো একেবারেই পরিষ্কার- স্বাস্থ্য সহকারীকে একটি অফিস আদেশ দিয়ে স্বাস্থ্য পরিদর্শকের পদমর্যাদায় বসিয়ে দেওয়ার সুযোগ বিধিমালার সাধারণ কাঠামোর সঙ্গে মেলে না।

তাহলে সাতজনের ক্ষেত্রে কোন বিধিতে?
চসিকের সাম্প্রতিক অফিস আদেশের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখানেই। যাঁদের স্বাস্থ্য পরিদর্শক (চলতি দায়িত্ব) দেওয়া হয়েছে, তাঁদের মধ্যে কয়েকজন স্বাস্থ্য সহকারী পদে স্থায়ী হয়েছেন এক বছরেরও কম সময় আগে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি। অথচ বিধিমালায় পদোন্নতির জন্য ন্যূনতম সাত বছরের চাকরির অভিজ্ঞতা নির্ধারিত। তাহলে তাঁদের ক্ষেত্রে সাত বছরের শর্ত কীভাবে পূরণ হলো? যদি সাত বছরের অভিজ্ঞতা না থাকে, তাহলে কোন বিধি বা কর্তৃত্ববলে তাঁদের স্বাস্থ্য পরিদর্শকের চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে- এর ব্যাখ্যা প্রয়োজন। আর যদি চসিক কর্তৃপক্ষের দাবি হয়, ‘চলতি দায়িত্ব’ দেওয়ার ক্ষেত্রে সাত বছরের শর্ত প্রযোজ্য নয়, তাহলে সেই দাবির আইনি ও বিধিগত ভিত্তিও প্রকাশ করা জরুরি বলে বলছেন আইনজ্ঞগণ।
কারণ একটি সরকারি পদে নিয়োগ, পদোন্নতি এবং চলতি দায়িত্ব- এই তিনটি বিষয়কে এক করে দেখার সুযোগ নেই। চলতি দায়িত্বের নামে যদি কার্যত উচ্চতর পদের দায়িত্ব, পদপরিচয় ও ক্ষমতা দেওয়া হয়, তাহলে সেই ব্যবস্থার বিধিগত ভিত্তি স্পষ্ট থাকা দরকার।

প্রথম আদেশেই ধরা পড়ল অসংগতি
চসিকের সচিব মোহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম স্বাক্ষরিত অফিস আদেশে স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিজ দায়িত্বের পাশাপাশি মোবাইল কোর্ট পরিচালনায় স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেট, আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের সঙ্গে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়। এডিস মশার লার্ভা বিস্তার রোধ, যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলা, খাদ্যে ভেজাল, অবৈধভাবে নালা দখল, রাস্তা ও ফুটপাতের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, পরিবেশ ও পলিথিনবিরোধী অভিযান, অবৈধ বাজার ও বিলবোর্ড উচ্ছেদসহ বিভিন্ন বিষয়ে মোবাইল কোর্টে সহযোগিতার জন্য এই দায়িত্ব দেওয়া হয়। একাধিক কর্মকর্তা জানান, মোট ১০ জনকে নিয়ে অফিস আদেশ করা হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে সাতজনই স্বাস্থ্য সহকারী। অভিযোগকারীদের দাবি, স্বাস্থ্য পরিদর্শকের দায়িত্ব পাওয়ার মতো প্রয়োজনীয় চাকরির অভিজ্ঞতা তাঁদের অনেকেরই নেই।
চসিকের সংস্থাপন শাখার কর্মকর্তা সংগীতা দাশও জানিয়েছেন, ১০ জনের মধ্যে সাতজন স্বাস্থ্য সহকারী রয়েছেন। কাজের স্বার্থে তাঁদের স্বাস্থ্য পরিদর্শক (চলতি দায়িত্ব) দেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানতে পেরেছেন। কিন্তু ‘কাজের স্বার্থে’- এই একটি বাক্য কি সরকারি চাকরি বিধিমালার নির্ধারিত যোগ্যতার বিকল্প হতে পারে? সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

কম্পিউটার অপারেটরও স্বাস্থ্য পরিদর্শক!
বিতর্ককে আরও ঘনীভূত করেছে চসিকের কম্পিউটার অপারেটর মো. সলিমুল্লাহ তালুকদারের বিষয়টি। অভিযোগ রয়েছে, তাঁর মূল পদ কম্পিউটার অপারেটর হলেও অফিস আদেশে তাঁর পদবির পাশে স্বাস্থ্য পরিদর্শক (চ.দ.) উল্লেখ করা হয়েছে এবং তাঁকে মোবাইল কোর্টে প্রসিকিউশন অফিসারের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। একইভাবে আরও ছয় স্বাস্থ্য সহকারীকে মোবাইল কোর্টে প্রসিকিউশন অফিসারের দায়িত্ব পালনের জন্য আদেশ দেওয়া হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এতে প্রশ্ন উঠেছে- একজন কম্পিউটার অপারেটর কীভাবে স্বাস্থ্য পরিদর্শকের পরিচয়ে দায়িত্ব পান? তাঁর স্বাস্থ্য পরিদর্শক পদে নিয়োগ বা পদোন্নতির যোগ্যতা রয়েছে কি না, সেটিও কি যাচাই করা হয়েছিল?

তালিকাতেও ‘স্বাস্থ্য পরিদর্শক’ নেই!
চসিক সচিবের বক্তব্য অনুযায়ী, ভ্রাম্যমাণ আদালতের ম্যাজিস্ট্রেটরা একজন করে সহকারী চেয়েছিলেন। এ জন্য স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে স্বাস্থ্য পরিদর্শকদের তালিকা চাওয়া হয়। স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে পাঠানো তালিকার ভিত্তিতেই প্রথমে অফিস আদেশ করা হয়েছিল। কিন্তু পরে তিনি দেখতে পান, এতে সমস্যা ও বিতর্ক সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে প্রথম আদেশ বাতিল করে সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের স্বাস্থ্য পরিদর্শকদের উল্লেখ করে নতুন আদেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। কিন্তু স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে পাঠানো তালিকাটিও এখন প্রশ্নের মুখে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, ওই তালিকায় পাঁচজন স্বাস্থ্য সহকারী, একজন কম্পিউটার অপারেটর এবং তিনজন পরিদর্শকের নাম ছিল। তাহলে স্বাস্থ্য পরিদর্শকদের তালিকা চাওয়া হলে স্বাস্থ্য সহকারী ও কম্পিউটার অপারেটরের নাম সেখানে গেল কীভাবে? আর সেই তালিকা যাচাই না করেই যদি অফিস আদেশ জারি হয়ে থাকে, তাহলে প্রশাসনিক যাচাই-বাছাইয়ের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের ভূমিকা কী ছিল?

আওয়ামী আমলের ‘চলতি দায়িত্ব’ এখনো চলছে?
চসিকের স্বাস্থ্য বিভাগে আরও একটি পুরোনো ব্যবস্থার অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় অস্থায়ী স্বাস্থ্য সহকারীদের বৈধভাবে স্বাস্থ্য পরিদর্শকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতায় ‘চলতি দায়িত্বের’ ব্যবস্থা এখনো চলে আসছে। অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, অতীতে যেভাবেই এই ব্যবস্থা চালু হয়ে থাকুক, বর্তমানে সেটি বহাল রাখার আগে সংশ্লিষ্টদের পদ, যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা এবং বিধিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্য যাচাই করা হয়েছে কি না। বিশেষ করে ২০১৯ সালে নতুন চাকরি বিধিমালা প্রণীত হওয়ার পর স্বাস্থ্য পরিদর্শক পদের নিয়োগ ও পদোন্নতির শর্ত স্পষ্টভাবে নির্ধারিত থাকলে পুরোনো কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে কেবল ‘চলতি দায়িত্ব’ নাম দিয়ে অনির্দিষ্টকাল চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ আছে কি না- সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

‘চলতি দায়িত্ব’ কি পদোন্নতির শর্টকাট?
চসিকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশের অভিযোগ, চলতি দায়িত্ব দেওয়ার সংস্কৃতির কারণে নিয়মিত পদোন্নতির কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ছে। একজন স্বাস্থ্য সহকারী যদি নির্ধারিত সাত বছরের অভিজ্ঞতা, শিক্ষাগত যোগ্যতা ও স্যানিটারি ইন্সপেক্টরশিপ ডিপ্লোমা অর্জন করে বিধি অনুযায়ী পদোন্নতির জন্য বিবেচিত হন, আর অন্যদিকে অপেক্ষাকৃত কম অভিজ্ঞ একজন কর্মীকে অফিস আদেশে একই পদের ‘চলতি দায়িত্ব’ দেওয়া হয়- তাহলে দীর্ঘদিন ধরে চাকরি করা যোগ্য কর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। একইভাবে পদোন্নতির প্রতিযোগিতায় বৈষম্যের প্রশ্নও এখণ সামনে এসেছে। আর যদি চলতি দায়িত্ব দেওয়ার মাধ্যমে একই ধরনের দায়িত্ব, ক্ষমতা ও পদপরিচয় ব্যবহার করা হয়, তাহলে বিধিমালা কার্যকারিতাও প্রশ্নের মুখে পড়ে।

বিতর্কের পর বাতিল- তদন্ত হবে কি?
চসিক সচিবের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রথম আদেশ বাতিল করা হয়েছে এবং পরে সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের স্বাস্থ্য পরিদর্শকদের উল্লেখ করে নতুন আদেশ দেওয়া হয়েছে। এতে তাৎক্ষণিক বিতর্ক হয়তো থামানো সম্ভব হয়েছে। কিন্তু প্রথম আদেশ কেন জারি হয়েছিল- সেই প্রশ্নের উত্তর রয়ে গেছে। কে তালিকা তৈরি করলেন? কে তালিকা যাচাই করলেন? কার সুপারিশে সাত স্বাস্থ্য সহকারীকে স্বাস্থ্য পরিদর্শক (চলতি দায়িত্ব) হিসেবে বিবেচনা করা হলো? কম্পিউটার অপারেটরের নাম কীভাবে স্বাস্থ্য পরিদর্শকের

পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত হলো?
সংশ্লিষ্টদের চাকরির মেয়াদ ও শিক্ষাগত-পেশাগত যোগ্যতা যাচাই করা হয়েছিল কি না? আর ২০১৯ সালের বিধিমালার ৬৯ নম্বর তফশিল বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল কি না? এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া শুধু আদেশ বাতিল করলেই প্রশাসনিক দায় শেষ হয় না।

বিধিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হলে দায় কার?
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন কর্মচারী চাকরি বিধিমালা, ২০১৯ কোনো অনানুষ্ঠানিক নির্দেশনা নয়; এটি সরকারি গেজেটে প্রকাশিত বিধিমালা। সেখানে স্বাস্থ্য পরিদর্শক পদের নিয়োগ ও পদোন্নতির যোগ্যতা স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। তাই বিধিমালায় নির্ধারিত যোগ্যতা পূরণ না করে কাউকে স্বাস্থ্য পরিদর্শকের দায়িত্ব দেওয়া হয়ে থাকলে তার বিধিগত ভিত্তি কী-এটি চসিক কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দাবি করে। আর যদি কর্তৃপক্ষের কাছে এমন কোনো বিধি, পরিপত্র বা অনুমোদন থাকে যার মাধ্যমে সাত বছরের অভিজ্ঞতা ছাড়াই স্বাস্থ্য সহকারীকে স্বাস্থ্য পরিদর্শকের চলতি দায়িত্ব দেওয়া যায়, সেটিও প্রকাশ করা উচিত। কারণ নিয়ম আছে, কিন্তু নিয়মের প্রয়োগ নেই- এমন প্রশাসনই সবচেয়ে বড় অনিয়মের জন্ম দেয়।

স্বাস্থ্য বিভাগের অনিয়মের খেসারত দিতে হয় নগরবাসীকেই
চসিকের স্বাস্থ্য বিভাগ শুধু একটি প্রশাসনিক শাখা নয়। ডেঙ্গু ও মশক নিয়ন্ত্রণ, খাদ্যে ভেজালবিরোধী অভিযান, পরিবেশ রক্ষা, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদসহ নগরবাসীর সরাসরি জীবনযাত্রার সঙ্গে যুক্ত গুরুত্বপূর্ণ কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে এই বিভাগ। এখানে দায়িত্ব বণ্টনে স্বচ্ছতা, যোগ্যতা ও জবাবদিহি না থাকলে তার প্রভাব মাঠপর্যায়ের কাজেও পড়বে।
বিশেষ করে মোবাইল কোর্টে যাঁরা ম্যাজিস্ট্রেটদের সহযোগিতা করবেন, তাঁদের দায়িত্ব ও পদপরিচয় নিয়ে কোনো অস্পষ্টতা থাকা উচিত নয়। কারণ মাঠপর্যায়ে তাঁদের কার্যক্রম নিয়ে পরবর্তীতে প্রশ্ন উঠলে তার দায় শুধু সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর ওপর বর্তাবে না; প্রশ্ন উঠবে পুরো প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নিয়েই।

এখন প্রয়োজন পূর্ণাঙ্গ যাচাই
চসিকের উচিত স্বাস্থ্য পরিদর্শক (চলতি দায়িত্ব) দেওয়া সব কর্মচারীর পদ, নিয়োগের তারিখ, চাকরির অভিজ্ঞতা, শিক্ষাগত যোগ্যতা, স্যানিটারি ইন্সপেক্টরশিপ ডিপ্লোমা এবং দায়িত্ব প্রদানের বিধিগত ভিত্তি প্রকাশ করা। একই সঙ্গে ২০১৯ সালের চাকরি বিধিমালার ৬৯ নম্বর তফশিলের সঙ্গে তাঁদের যোগ্যতা মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন। কারণ প্রশ্নটি শুধু সাতজন কর্মচারীর নয়। প্রশ্নটি চসিকের নিয়োগ-পদোন্নতির পুরো ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতার। যদি নিয়ম অনুযায়ী তাঁরা যোগ্য হন, তাহলে প্রমাণসহ বিষয়টি পরিষ্কার করা হোক। আর যদি যোগ্যতা না থাকে, তাহলে কে তাঁদের এমন দায়িত্ব দিলেন, কেন দিলেন এবং কোন কর্তৃত্বে দিলেন- তা তদন্ত করে দায় নির্ধারণ করা হোক। নইলে ‘কাজের স্বার্থে’ দায়িত্ব দেওয়ার এই সংস্কৃতি একসময় এমন জায়গায় পৌঁছাবে, যেখানে পদে না থেকেও পদ পাওয়া যাবে, যোগ্যতা না থাকলেও দায়িত্ব পাওয়া যাবে- শুধু একটি অফিস আদেশই যথেষ্ট হবে। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন- চসিকের নিজস্ব চাকরি বিধিমালায় যখন স্বাস্থ্য পরিদর্শক হতে সাত বছরের অভিজ্ঞতা, নির্ধারিত শিক্ষাগত যোগ্যতা ও স্যানিটারি ইন্সপেক্টরশিপ ডিপ্লোমার শর্ত স্পষ্ট, তখন এক বছরেরও কম অভিজ্ঞতার স্বাস্থ্য সহকারীরা কোন নিয়মে স্বাস্থ্য পরিদর্শকের দায়িত্ব পেলেন?

দায়িত্বে থাকবেন স্বাস্থ্য পরিদর্শকরাই
এ বিষয়ে আইনজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য, মোবাইল কোর্টে সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেটদের সঙ্গে সহযোগিতার জন্য স্বাস্থ্য পরিদর্শকদেরই দায়িত্ব পালন করা উচিত। বিশেষ করে নিরাপদ খাদ্যসংক্রান্ত অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত কাঠামো ও দায়িত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রশিক্ষিত ও দায়িত্বপ্রাপ্ত স্বাস্থ্য পরিদর্শকদেরই মাঠপর্যায়ে কাজ করার কথা। ফলে স্বাস্থ্য পরিদর্শকের পদে না থেকেও স্বাস্থ্য সহকারী বা অন্য কোনো পদে কর্মরত ব্যক্তিকে শুধু অফিস আদেশের মাধ্যমে স্বাস্থ্য পরিদর্শকের পরিচয়ে ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে মোবাইল কোর্টে দায়িত্ব দেওয়া কতটা বিধিসম্মত-এ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। আইনজ্ঞদের মতে, দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে ব্যক্তির প্রকৃত পদ, নির্ধারিত যোগ্যতা ও সংশ্লিষ্ট আইনে অর্পিত ক্ষমতাই বিবেচ্য; কেবল প্রশাসনিক আদেশ দিয়ে কোনো কর্মচারীর পদমর্যাদা বা আইনগত দায়িত্বের প্রকৃতি পরিবর্তন করা যায় না। এ কারণে চসিকের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেটদের সঙ্গে দায়িত্ব পালনে প্রকৃত স্বাস্থ্য পরিদর্শকদেরই নিয়োজিত করার দাবি উঠেছে।##


সম্পর্কিত খবর