অপরাধ

ঘুষের বিনিময়ে দলিল, সরকারি জমিও ‘ব্যক্তিগত’!

জমি রেজিস্ট্রি করতে সরকারি নিয়মে যে টাকা দেওয়ার কথা, তার সঙ্গে যোগ হচ্ছে কয়েকগুণ বাড়তি অর্থ। কারও অভিযোগ- পাঁচ গুণ, কারও দাবি- সাত গুণ পর্যন্ত টাকা না দিলে নাকি সহজে মেলে না কাঙ্ক্ষিত সেবা। ত্রুটিপূর্ণ দলিল, হেবা, আমমোক্তারনামা কিংবা বিতর্কিত জমি- দরদাম ঠিক থাকলে সবই ‘ম্যানেজ’ করার অভিযোগ। আর এই পুরো প্রক্রিয়ার নেপথ্যে রয়েছেন পটিয়া সাব-রেজিস্ট্রার মেজবাহ উদ্দিন আহমদ- এমনই গুরুতর অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।

শুধু ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ নয়; প্রায় ৫ কোটি টাকা মূল্যের সরকারি ‘ক’ তফসিলভুক্ত জমি ব্যক্তির নামে রেজিস্ট্রি এবং রেজিস্ট্রেশনবিহীন পুরোনো আমমোক্তারনামার ভিত্তিতে প্রায় ২০ কোটি টাকা মূল্যের জমি বিক্রয় দলিল করার অভিযোগও সামনে এসেছে।

ফলে প্রশ্ন উঠেছে- পটিয়া সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে আইন চলছে, নাকি টাকার বিনিময়ে আইনের ব্যতিক্রম তৈরির ব্যবস্থা হয়েছে?

৫ কোটি টাকার সরকারি জমি গেল ব্যক্তির নামে
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগটি দক্ষিণ ভূর্ষি মৌজার প্রায় ৫ কোটি টাকা মূল্যের জমি নিয়ে। অভিযোগ অনুযায়ী, জমিটি সরকারি ‘ক’ তফসিলভুক্ত। এমন জমি ব্যক্তির নামে হস্তান্তরের আগে প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার কথা। কিন্তু সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই দানপত্র দলিলের মাধ্যমে জমিটির মালিকানা ব্যক্তির নামে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে পটিয়া সাব-রেজিস্ট্রারের বিরুদ্ধে।

ঘটনাটি আরও রহস্যজনক। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, আদালতে মামলা পরিচালনার জন্য আবছার নামে এক ব্যক্তিকে আমমোক্তারনামা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পটিয়ার পরিবর্তে তাকে নেওয়া হয় কর্ণফুলী উপজেলা ক্যাম্প সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে। ওই ক্যাম্পের দায়িত্বেও ছিলেন মেজবাহ উদ্দিন।

সেখানে দলিলের প্রকৃত ধরন না জানিয়ে ৫৪৯৬/২৫ নম্বর দলিল রেজিস্ট্রি করা হয় বলে অভিযোগ।

পরে আবদুল আউয়ালসহ সংশ্লিষ্টরা জানতে পারেন, নুরুল আবছার নামে এক ব্যক্তি তথ্য গোপন করে প্রায় ১০ লাখ টাকার বিনিময়ে ওই জমি নিজের নামে রেজিস্ট্রি নিয়ে নিয়েছেন। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকেও তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নির্দেশে বিষয়টি তদন্ত করেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) রয়া ত্রিপুরা। তদন্তে জমিটি সরকারি হিসেবে শনাক্ত হয়েছে বলে জানান তিনি।

তার বক্তব্য অনুযায়ী, ব্যক্তির নামে খতিয়ান ও হালনাগাদ দাখিলা ছাড়া সাব-রেজিস্ট্রারের এ ধরনের জমি রেজিস্ট্রি করার সুযোগ নেই। অর্থাৎ, জমিটি যদি সরকারি হয় এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না থাকে, তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে- দলিলটি রেজিস্ট্রি হলো কীভাবে?

১৫ বছর আগের ‘পাওয়ার’, ২০ কোটি টাকার জমি!

পটিয়ার দলিল-বাণিজ্যের অভিযোগ এখানেই থেমে নেই।

কর্ণফুলীর চরলক্ষ্যা মৌজায় প্রায় ২০ কোটি টাকা মূল্যের জমির একটি বিক্রয় দলিল নিয়েও উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন।

অভিযোগ, প্রবাস থেকে ২০১০ সালে পাঠানো একটি আমমোক্তারনামা যথাসময়ে রেজিস্ট্রি করা হয়নি। অথচ প্রায় ১৫ বছর পর, ২০২৫ সালের ২২ ডিসেম্বর, সেই রেজিস্ট্রেশনবিহীন আমমোক্তারনামার ভিত্তিতে ১২০৫৩/২৫ নম্বর বিক্রয় দলিল রেজিস্ট্রি করা হয়।

অভিযোগকারীদের দাবি, এ দলিল সম্পাদনে প্রায় ১৫ লাখ টাকা অবৈধ লেনদেন হয়েছে।

এখানেই প্রশ্নের শেষ নয়। রেজিস্ট্রেশন আইনের বিধান অনুযায়ী আমমোক্তারনামা নিয়ে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার বিষয় রয়েছে। তাহলে ২০১০ সালের একটি রেজিস্ট্রেশনবিহীন আমমোক্তারনামা কীভাবে ২০২৫ সালে এসে কোটি কোটি টাকার জমি বিক্রয়ের ভিত্তি হলো- এই প্রশ্নের উত্তরও চাওয়া হচ্ছে।

দরদামেই ‘ফয়সালা’!
স্থানীয়দের অভিযোগ, পটিয়া সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে সেবা নিতে গিয়ে আগে জানতে হয়—‘অফিসের বাইরে’ কত টাকা দিতে হবে। দলিলের মূল্য যত বেশি, ‘বাড়তি খরচের’ অঙ্কও তত বেশি- এমন অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, অনেক ক্ষেত্রে দলিলের ঘোষিত মূল্যের ওপর নগদ এক শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হয়। হেবা, আমমোক্তারনামা কিংবা ত্রুটিপূর্ণ দলিলের ক্ষেত্রে আবার নির্ধারিত কোনো হার নেই- চলে দরদাম।

দলিল বৈধ কি না- তার চেয়ে বড় হয়ে ওঠে ‘কত টাকা দেওয়া যাবে’।

অভিযোগ রয়েছে, দালাল ও দলিল লেখকচক্রের মাধ্যমে এই দরকষাকষি চলে। প্রথমে সেবা প্রার্থীর সঙ্গে যোগাযোগ, এরপর কাগজপত্র ‘দেখা’, তারপর সমস্যার তালিকা এবং সবশেষে সমাধানের বিনিময়ে টাকার অঙ্ক নির্ধারণ—এমন একটি প্রক্রিয়া এখানে চালু রয়েছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।

অফিস সহকারীকে ঘিরে যত অভিযোগ
একাধিক দলিল লেখক ও ভুক্তভোগীর অভিযোগে অফিস সহকারী জাহাঙ্গীর সিকদারের নামও এসেছে। তাদের দাবি, তার মাধ্যমে সেবা প্রার্থীদের সঙ্গে দরকষাকষি হয়। পরে সাব-রেজিস্ট্রারের সঙ্গে কথিত সমঝোতা হলে ত্রুটিপূর্ণ দলিলও রেজিস্ট্রির ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, এভাবেই কার্যালয়টিতে গড়ে উঠেছে কথিত ‘দালাল-দলিল লেখক-অসাধু কর্মকর্তা’ চক্র।

তবে জাহাঙ্গীর সিকদার তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

দলিল লেখকরাও এবার প্রশ্ন তুলছেন
অভিযোগের মাত্রা এতটাই বেড়েছে যে খোদ দলিল লেখক সমিতির পক্ষ থেকেও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। পটিয়া দলিল লেখক সমিতির সভাপতি শামসুদ্দোহা জানান, নামজারি বা জরিপ খতিয়ান এবং হালনাগাদ খাজনার রসিদ ছাড়াই সরকারি জমি ব্যক্তির নামে রেজিস্ট্রেশন করা হয়েছে।

এ ঘটনায় সমিতির পক্ষ থেকে সাব-রেজিস্ট্রার মেজবাহ উদ্দিন আহমদকে আইনজীবীর মাধ্যমে আইনি নোটিশ দিয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

এ অবস্থায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে- যে কার্যালয়ে জমির মালিকানা পরিবর্তনের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ হয়, সেখানে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ছাড়াই কোটি টাকার সম্পত্তির দলিল সম্পাদনের অভিযোগ কতটা গুরুতর?

‘সব দায় আমার’- বলছেন সাব-রেজিস্ট্রার
অভিযোগের বিষয়ে পটিয়া সাব-রেজিস্ট্রার মেজবাহ উদ্দিন আহমদ ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, কার্যালয়ে সব দলিল নিয়মতান্ত্রিকভাবেই সম্পন্ন হয়। পটিয়ায় দলিল রেজিস্ট্রির চাপ বেশি থাকায় প্রতিটি দলিল একা পরীক্ষা করা তার পক্ষে সম্ভব নয় বলেও জানান তিনি। তবে তিনি বলেন, ‘সব দায় আমার।’

কর্ণফুলী উপজেলা ক্যাম্পে দলিল রেজিস্ট্রি নিয়ে আপত্তির বিষয়েও তিনি বলেন, পটিয়া সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের পরিবর্তে কর্ণফুলী ক্যাম্পে দলিল সম্পাদনে কোনো বাধা নেই।

রেজিস্ট্রেশনবিহীন আমমোক্তারনামার ভিত্তিতে জমি রেজিস্ট্রি করা যায় না- এ কথা স্বীকার করলেও চরলক্ষ্যার ঘটনায় তার ব্যাখ্যা ভিন্ন। তার দাবি, সংশ্লিষ্ট পাওয়ারটি সরকারি আদেশ জারির আগের হওয়ায় সেটির ভিত্তিতে দলিল রেজিস্ট্রিতে আইনগত বাধা ছিল না।

এখন বড় প্রশ্ন- জবাবদিহি কোথায়?
পটিয়া সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়কে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো অনিয়ম, নাকি এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের একটি সংঘবদ্ধ ব্যবস্থা- তা নিরপেক্ষ তদন্তেই স্পষ্ট হতে পারে। তবে ৫ কোটি টাকার সরকারি জমি ব্যক্তির নামে রেজিস্ট্রি, ২০ কোটি টাকার জমি নিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ দলিল, রেজিস্ট্রেশনবিহীন আমমোক্তারনামা এবং ঘুষের বিনিময়ে ত্রুটিপূর্ণ দলিল রেজিস্ট্রির অভিযোগ- সব মিলিয়ে বিষয়টি আর হালকা করে দেখার সুযোগ নেই।

সরকারি জমির মালিকানা রক্ষার দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানেই যদি সরকারি সম্পত্তি ব্যক্তির নামে চলে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে, তাহলে সেটি কেবল একটি দলিলের অনিয়ম নয়; এটি রাষ্ট্রীয় সম্পদের নিরাপত্তা ও ভূমি ব্যবস্থাপনার ওপর সরাসরি প্রশ্ন।

তাই সংশ্লিষ্টদের দাবি- অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হোক। কোন দলিল কীভাবে রেজিস্ট্রি হয়েছে, কোন কাগজপত্রের ভিত্তিতে হয়েছে, কারা এতে সহযোগিতা করেছে এবং কোনো অবৈধ আর্থিক লেনদেন হয়েছে কি না- সবকিছু খতিয়ে দেখা হোক।

কারণ জমির দলিল কেবল একটি কাগজ নয়। সেটিই কারও সম্পত্তির মালিকানা নির্ধারণ করে। আর সেই দলিল যদি আইনের বদলে টাকার জোরে তৈরি হওয়ার অভিযোগ ওঠে, তাহলে প্রশ্ন শুধু পটিয়া সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের নয়- প্রশ্ন ওঠে পুরো ভূমি নিবন্ধন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়েই।


সম্পর্কিত খবর