
নিজস্ব প্রতিবেদক :
চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদকে নিয়ে জেলার রাউজান উপজেলা এবং নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থানা এলাকায় নিয়ে মহড়া দেওয়া ও অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান পরিচালনা করেছে পুলিশ। রবিবার (৬ এপ্রিল) রাতে এবং সোমবার (৭ এপ্রিল) দিনের বেলায় নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থানা এলাকায় এ অভিযান পরিচালনা করা হয়। তবে অভিযানে কোন অস্ত্র উদ্ধার হয়নি।
এ ঘটনায় মঙ্গলবার (৮ এপ্রিল) সন্ধ্যায় এক ভিডিও বার্তায় সাজ্জাদের স্ত্রী তামান্না বলেন, ‘আমি সাজ্জাদের বৌ তামান্না। কোথাও কি এমন নজির আছে, এভাবে রিমান্ডের আসামিকে গরুর মতো রশি বেঁধে আমার হাসবেন্ডকে এলাকায় এলাকায় নিয়ে গিয়ে মাইকিং করে জিরো ট্রলারেন্স ঘোষণা করছে ওসি আরিফ (বায়েজিদ বোস্তামী থানার ওসি মো. আরিফুর রহমান)। আসলে আমার হাসবেন্ড কি কোরবানের গরু? আমার হাসবেন্ডকে নিয়ে গিয়ে মাইকিং করছে। জিরো ট্রলারেন্স বললে ওই ট্রলারে কি আর কোন জায়গা নেই। আর কোন ক্রিমিনালকে অ্যারেস্ট করার জন্য। আমার সাজ্জাদকে যে রকম ইচ্ছে সে রকম করতেছেন। কোথাও কি নজির আছে একজন রিমান্ডের আসামিকে এলাকা ভিত্তিক ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে গরুর রশি বেঁধে যেমন ইচ্ছে তেমন করতেছে প্রশাসন। আসলে ওর ফ্যামিলির কি কোন ব্যাকগ্রাউন্ড নাই, তার হয়ে কথা বলার কেউ নেই তো। আমিও তো মেয়ে মানুষ, আমাকেও দুই-তিনটা মামলা দিয়ে বসে আছে। এখন আমি কি করব বলেন?
তিনি বলেন, আমি আপনাদের উপর ছেড়ে দিয়েছি। আপনাদের কি মনে হয়, এটা কি মানবাধিকার লঙঘন হচ্ছে না। এভাবে গরুর রশি দিয়ে বেঁধে এলাকায় এলাকায় গিয়ে আমার হাসবেন্ডকে অপমান করা হচ্ছে কেন? আমি আপনাদের কাছে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলাম।
আমার হাজবেন্ড যদি অপরাধী হয় তার বিচার আদালত করবে। ওসি আরিফ আমার হাসবেন্ডকে অ্যারেস্ট করে নাই। আমার হাসবেন্ডকে সূচি অ্যারেস্ট করিয়েছে। এটা আমি বার বার বলেছি। ওসি আরিফের ওইখানে কোন সুযোগও নাই। বসুন্ধরা সিটিতে আমরা ঘুরতে গেছি। ওই অবস্থায় আমার হাসবেন্ডকে সূচি দেখেছে। দেখার পর আমার হাসবেন্ডকে সিকিউরিটি গার্ড রুমে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে নেওয়ার তিন ঘন্টা পর পুলিশ এসেছে। আমি এবং আমার স্বামী এক সঙ্গে অ্যারেস্ট হই। আমি পরদিন ছুটে আসি। আমার স্বামী যখন তামান্না তামান্ন করে ছিল্লাইতেছিল আমি তখন আমার মোবাইল হারিয়ে গেছে তখন পাঁচ মিনিটের জন্য নিচে নেমেছিলাম। এক সাথে অ্যারেস্ট হয়েছিলাম। ওসি আরিফ কিংবা সিএমপির কোন কমিশনার আমার হাসবেন্ডকে অ্যারেস্ট করে নাই। কিন্তু ওরা সিম্পতি নেওয়ার জন্য আমার হাসবেন্ডকে আজকে রাস্তায় নামিয়ে এত অপমান না করে গুলি করে মারতে পারছে না।
গত রবিবার রাউজানের মুন্সিরঘাটা এবং কদলপুর এলাকায় ছোট সাজ্জাদকে নিয়ে অভিযান পরিচালনা করা হয়। সোমবার দুপুরে নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থানা এলাকায় তাকে নিয়ে অভিযান পরিচালনা করা হয়। এ সময় সাজ্জাদের মুখ হেলমেট দিয়ে ডাকা ছিল। অভিযানে রাউজান থানা পুলিশের পাশাপাশি চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের সোয়াট সদস্য, থানা পুলিশের বিপুল সংখ্যক সদস্য উপস্থিত ছিলেন।
অভিযান চলাকালে এক পুলিশ কর্মকর্তা হ্যান্ড মাইকে ঘোষণা দেন ‘সিএমপির মাননীয় পুলিশ কমিশনারের নির্দেশে শীর্ষ সন্ত্রাসী ছোট সাজ্জাদকে গ্রেফতার করা হয়েছে। রাষ্ট্রের কাছে কোন সন্ত্রাসীর জায়গা হবে না। আপনাদের এলাকায় কোন সন্ত্রাসী থাকে তাহলে তাদের পরিণতি এ ছোট সাজ্জাদের মতো হবে। সন্ত্রাসীদের যারা পৃষ্ঠপোষকতা করেন তাদেরকেও আইনের আওতায় আনা হবে।’
চান্দগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আফতাব উদ্দিন বলেন, ‘সন্ত্রাসী সাজ্জাদকে রিমান্ডে জিজ্ঞেসাবাদ করা হচ্ছে। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে রবিবার রাতে রাউজান উপজেলায় অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান পরিচালনা করা হয়। সোমবার বায়েজিদ এলাকায় অভিযান পরিচালনা করা হয়। সে আমাদের যেসব তথ্য দিচ্ছেন সেসব এলাকায় অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। অভিযান চলমান আছে।’
গত ১৫ মার্চ দিবাগত রাতে ঢাকার বসুন্ধরা শপিং মল থেকে ছোট সাজ্জাদকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তার বিরুদ্ধে হত্যাসহ বিভিন্ন অভিযোগে অন্তত ১৭টি মামলা রয়েছে। নগরের চান্দগাঁও থানার আলোচিত তাহসীন হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ছোট সাজ্জাদের পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। রবিবার (৬ এপ্রিল) চট্টগ্রামের ষষ্ঠ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট এসএম আলাউদ্দিন মাহমুদের আদালত এ রিমান্ড মঞ্জুর করেন। তদন্তকারী কর্মকর্তার ১০ দিনের রিমান্ড আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
২৯ মার্চ রাত পৌনে ৩টার দিকে বাকলিয়া এক্সেস রোডে প্রাইভেট কারে থাকা দুই জনকে গুলি করে হত্যার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় গ্রেফতার ছোট সাজ্জাদকে রবিবার শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত। এ মামলায় সাজ্জাদকে হুকুমের আসামি করা হয়। সাজ্জাদকে ধরিয়ে দেওয়ার অভিযোগে প্রাইভেটকারে থাকা সারোয়ার হোসেন বাবলাকে হত্যার উদ্দেশ্যে এ হামলা চালানো হয় বলে ধারণা করছে পুলিশ।
এতে সারোয়ারের প্রাইভেটকার চালক বখতিয়ার হোসেন মানিক ও তার সহযোগী আবদুল্লাহ গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। তবে অক্ষত ছিলেন সারোয়ার ও তার সহযোগী রবিউল ইসলাম রবিন, ইমন ও হৃদয়। এর মধ্যে গুলিবিদ্ধ রবিন ও হৃদয় চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। এ ঘটনায় মঙ্গলবার (১ এপ্রিল) নগরের বাকলিয়া থানায় মামলাটি করেন নিহত বখতিয়ার হোসেন মানিকের মা ফিরোজা বেগম।
সাজ্জাদকে ধরতে গত ৩০ জানুয়ারি পুরস্কার ঘোষণা করেছিলেন চট্টগ্রাম নগর পুলিশ কমিশনার হাসিব আজিজ। এর আগের দিন নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থানার ওসি আরিফুর রহমানকে ফেসবুক লাইভে এসে হুমকি দেন সাজ্জাদ। তাকে গ্রেফতারের পরদিন প্রতিক্রিয়া জানিয়ে তার স্ত্রী তামান্না শারমিনের বক্তব্যের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে। ভিডিওতে তামান্না শারমিনকে বলতে শোনা যায়, ‘আমরা কাঁড়ি কাঁড়ি, বান্ডিল বান্ডিল টাকা ছেড়ে আমার জামাইকে (স্বামী) নিয়ে আসবো। যারা এই ঘটনা ঘটিয়েছে, তাদের ছাড় দেওয়া হবে না।’
